আফ্রিকার আধুনিক কবিতার জগতে একটি উজ্জ্বল নাম আতুকেই জন ওকাই। ১৯৪১ সালের ১৫ মার্চ ঘানার আক্রায় জন্ম নেওয়া এই কবি ২০১৮ সালের ১৩ জুলাই প্রয়াত হন। তাঁর মৃত্যুর পর আফ্রিকা এবং বিশ্বের নানা প্রান্তে তাঁর কবিতার শক্তিমত্তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। আফ্রিকান মৌখিক কবিতা ও পারফরম্যান্স পোয়েট্রির বিকাশে তাঁর অবদান স্মরণীয়। ইংরেজি ভাষার গতানুগতিক ব্যাকরণ ভেঙে তিনি নতুন শব্দ, ধ্বনি ও ছন্দ নির্মাণে নিরীক্ষা চালিয়েছেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি কবিতা ও নাট্যচর্চায় নিবিষ্ট ছিলেন।

আফ্রিকান পরিচয়, সামাজিক ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা এবং উপনিবেশবাদের সমালোচনা—এসব বিষয় তাঁর কবিতার মূল উপজীব্য। সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদা ও মানবিকতার প্রশ্নও তাঁর কবিতাকে গতিশীল করেছে। পরবর্তী প্রজন্মের কবিরা তাঁর কবিতা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। কালো মানুষের ওপর সাদা শাসকদের অত্যাচার, লুণ্ঠন ও নিষ্ঠুরতার কাহিনি অনেক লেখকের রচনায় উঠে এলেও ওকাইয়ের কবিতায় তা ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। উপনিবেশবাদীরা ক্রীতদাসদের জাহাজে করে নিয়ে যাওয়ার সময় যেভাবে পাটাতনে বেঁধে ফেলে রাখত, অসুস্থদের সমুদ্রে ফেলে দিত—সেসব ঘটনার প্রতিধ্বনি তাঁর কবিতায় মেলে। কলোনিয়াল শাসকেরা আফ্রিকার ধনসম্পদ লুণ্ঠনের পাশাপাশি তাদের ভাষা, মিথ, লোককাহিনি ও সংস্কৃতিকেও পঙ্গু করে দিয়েছিল।

আফ্রিকান সাহিত্য বলতে দীর্ঘদিন মৌখিক সাহিত্যই বোঝানো হতো। উনিশ শতকে এসে তার লেখ্যরূপ শুরু হয় এবং বিশ শতকে তা বিস্তৃত হতে থাকে। তবে ইংরেজি ভাষা ইতিমধ্যে অনেকের কাছেই পরিচিত হয়ে ওঠে এবং অনেকে ইংরেজিতেই লেখালেখি চালিয়ে যান। সোমালিয়ার মতো দেশে ১৯৭২ সালের আগপর্যন্ত সাহিত্যের কোনো লেখ্যরূপ ছিল না। সোমালি কবি মোহাম্মদ ইব্রাহিম ওয়ারসেম হাদরাউইকে ‘সোমালিয়ার শেক্সপিয়ার’ বলা হয়। সোমালিয়ার লেখক মুসা গালাল দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে মৌখিক সাহিত্য টেপ রেকর্ডারে ধারণ করেছিলেন।

চিনুয়া আচেবেসহ অনেক আফ্রিকান লেখক ইংরেজিতে লেখার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। আচেবের মতে, আফ্রিকার মানুষের চিন্তাভাবনা ও মানসজগৎ ইংরেজি ভাষাই কেবল ধারণ করতে পারে। তবে নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো এই মতের বিরোধিতা করে নিজের মাতৃভাষা গিকুয়ুতে ফিরে যান এবং আফ্রিকান লেখকদের নিজের ভাষায় লেখার আহ্বান জানান। তার পরও বেশির ভাগ লেখক ইংরেজিতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ওকাই ইংরেজি ভাষার প্রতিষ্ঠিত বাক্যরীতি ও শব্দভান্ডার ভেঙে দিয়ে বিস্ময়কর ধ্বনিগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে এক স্বতন্ত্র কাব্যছন্দ সৃষ্টি করেছেন। নাইজেরিয়ার সাহিত্য সমালোচক প্রফেসর ফেমি ওসোফিসানের মতে, আফ্রিকান কবিতাকে তার প্রাগৈতিহাসিক উৎস—তালবাদ্যের স্পন্দন ও ছন্দে ফিরিয়ে আনতে প্রথম সুস্পষ্ট উদ্যোগ নেন ওকাই।

ওকাইয়ের কবিতার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর ফেটিশ ধর্মযাজকদের আচারের সঙ্গে সাদৃশ্য। উপাস্যের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য যাজকেরা যেমন মোহান্ধাবস্থায় নিজেদের নিয়ে যান, তেমনি ওকাই তাঁর কবিতায় স্বপ্নাবিষ্ট অবস্থায় কথা বলেন। তখন ভাষা হয়ে ওঠে গভীর মেজাজি এবং চিত্রকল্প হোঁচট খেতে খেতে এগিয়ে চলে। তাঁর কবিতার কৃতিত্ব লক্ষ করা যায় শব্দের ধ্বনিবৈচিত্র্যের অপূর্ব সৃষ্টিযোজনে। ‘লরগরলিগি: লগারিদমস অ্যান্ড আদার পোয়েমস’ বইয়ের ‘সরসারার্স ডেথ মাস্ক... রেইন মেকার্স ক্লথস...’ কবিতাটি আফ্রিকান সাংস্কৃতিক উপাদানের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি প্রচুর আঞ্চলিক শব্দ ও থিম ব্যবহার করেছেন।

ওকাইয়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ফ্লাওয়ারফল’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে লন্ডনের রাইটার্স ফোরাম থেকে। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ওথ অব দ্য ফন্টমফ্রম অ্যান্ড আদার পোয়েমস’ (১৯৭১), ‘লরগরলিগি: লগারিদমস অ্যান্ড আদার পোয়েমস’ (১৯৭৪), ‘ফ্রিডম সিম্ফনি: সিলেক্টেড অ্যান্ড নিউ লাভ পোয়েমস’ (২০০৮) এবং ‘মানডেলা দ্য স্পিয়ার অ্যান্ড আদার পোয়েমস’ (২০১৩)। তিনি ঘানা ইউনিভার্সিটির আধুনিক ভাষা বিভাগে রাশিয়ান ভাষার লেকচারার ছিলেন এবং ইনস্টিটিউট অব আফ্রিকান স্টাডিজের ক্রিয়েটিভ রাইটিং কোর্সে বক্তৃতা দিতেন। জার্মান ও রুশসহ বেশ কয়েকটি ভাষায় তাঁর কবিতা অনূদিত হয়েছে। তিনি ‘দ্য লেবেল সেন্টেনারি কমেমোরেটিভ গোল্ড মেডেল’, ‘ইন্টারন্যাশনাল লোটাস প্রাইজ’, ‘সি মারকোনি গোল্ড মেডেল’ এবং ২০০৭ সালে রাষ্ট্র কর্তৃক ‘দ্য ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড অব মেম্বার অব দ্য অর্ডার অব দ্য ভোল্টা’ লাভ করেন।

ঘানা ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক কফি আসারী ওপোকো এক প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন, ষাটের দশকে একজন আমেরিকান ওকাইকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন—‘কার ঘোড়ায় আফ্রিকা চড়বে: পূর্বের না পশ্চিমের?’ ওকাই উত্তর দিয়েছিলেন যে আফ্রিকার নিজস্ব ঘোড়া রয়েছে এবং সে তাতে চড়েই এগিয়ে যাবে। তিনি আফ্রিকার তরুণ লেখকদের নিজস্ব ঐতিহ্যের পিঠে সওয়ার হয়ে মুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। একইভাবে বাঙালিরও নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে, যার যত্ন নেওয়া দরকার। ওকাই ঘানা তথা আফ্রিকান আধুনিক কবিতার অন্যতম প্রভাবসঞ্চারী কবি হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।