দেশব্যাপী চলমান গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন কার্যক্রম চালু রাখতে সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে সিলিন্ডারে গ্যাস সংগ্রহ করার পথ খুঁজছে তৈরি পোশাক শিল্পের কারখানাগুলো। তবে এই বিষয়ে সরকারি স্তর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত নির্দেশ বা ছাড় দেওয়ার তথ্য নেই বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) দাবি করছে, পোশাক কারখানায় সিলিন্ডারে গ্যাস সরবরাহ বন্ধে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির দেওয়া নির্দেশ প্রত্যাহারের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী। অন্যদিকে, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) সিএনজি স্টেশন মালিকদের সংগঠনকে চিঠি দিয়ে কারখানাগুলোতে সিলিন্ডারে গ্যাস সরবরাহে সহযোগিতা চেয়েছে।
সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, খোলা সিলিন্ডার, কাভার্ড ভ্যান ও লরিতে গ্যাস না দেওয়ার বিষয়ে তিতাসের নির্দেশনা এখনও বহাল রয়েছে। এই অবস্থায় করণীয় কী হবে তা জানতে পেট্রোবাংলাকে চিঠি দিয়েছে সংগঠনটি। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ গ্যাস আইন, ২০১০ অনুযায়ী সিএনজি শ্রেণির সংযোগ থেকে অনুমোদন ছাড়া শিল্পকারখানায় গ্যাস ব্যবহার করলে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
বিকেএমইএ গত ২৮ জুলাই তাদের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জানিয়েছে, তিতাসের সার্কুলার নিয়ে সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জ্বালানি সচিবের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। ওই আলোচনায় গ্যাস সংকটের কারণে রপ্তানিকারকদের উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং পোশাক রপ্তানিতে এর নেতিবাচক প্রভাবের কথা তুলে ধরা হয়। চিঠিতে দাবি করা হয়, বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে জ্বালানি মন্ত্রী তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ওই সার্কুলার জরুরি ভিত্তিতে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি বর্তমান সংকটকালে তৈরি পোশাক শিল্পকারখানায় ব্যবহারের জন্য সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে গ্যাস সংগ্রহ অব্যাহত রাখার কথাও বলা হয়। এর ভিত্তিতে বিকেএমইএর সদস্য কারখানাগুলো নিরাপত্তা বিধি ও সরকারি নির্দেশনা মেনে সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে গ্যাস সংগ্রহ করতে পারবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনটি আরও জানিয়েছে, কারখানাগুলো তাদের এলএমজি বা মোবাইল গ্যাস ব্যবস্থা পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা করতে পারবে এবং এই সাময়িক গ্যাস সমস্যা ৮ আগস্ট পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, পোশাক কারখানায় সিলিন্ডারের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দেওয়া হলেও বুধবার দুপুর পর্যন্ত কোনো লিখিত আদেশ পাওয়া যায়নি। তিনি আরও বলেন, তিতাস শিল্পকারখানার কাছ থেকে জামানত নিয়ে গ্যাস সংযোগ দিয়েছে এবং কারখানায় গ্যাস সরবরাহ করা প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব। গ্যাস সংকটের সময় শিল্পকারখানাকে সিলিন্ডারের মাধ্যমে গ্যাস নেওয়ার সাময়িক ছাড় দেওয়া উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান ২৮ জুলাই বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতিকে চিঠি দিয়ে পোশাক কারখানায় সিলিন্ডারের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহে সহযোগিতা চান। চিঠিতে বলা হয়, যেসব কারখানা সিলিন্ডারের মাধ্যমে গ্যাস নিতে চায়, তাদের সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে গ্যাস সরবরাহে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। তবে সিএনজি স্টেশনগুলো সিলিন্ডারের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ করতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণেই সংগঠনটি সিএনজি স্টেশন মালিকদের সংগঠনের কাছে সহায়তা চেয়েছে।
এদিকে, গত ২৭ জুলাই আমিনবাজারের সালিপুরের এইচ কে ফিলিং স্টেশনকে একটি চিঠি দেয় তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি। তিতাসের মেট্রো ঢাকা বিক্রয় বিভাগ-৬ থেকে পাঠানো চিঠিতে যানবাহন ছাড়া অননুমোদিত খোলা সিলিন্ডার বা ক্যাসকেড সিলিন্ডারবাহী কাভার্ড ভ্যান ও লরিতে প্রাকৃতিক গ্যাস বিক্রি ও সরবরাহ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। চিঠিতে একে বাংলাদেশ গ্যাস আইন, ২০১০ এবং গ্যাস বিপণন নিয়মাবলি, ২০২৬-এর ‘পরিপন্থি ও খুবই ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করা হয়। এর আগেও একই বিষয়ে ওই ফিলিং স্টেশনকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে তিতাস।
এই পরিস্থিতিতে সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন স্টেশন থেকে সিলিন্ডারের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহে নিষেধাজ্ঞা থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও ছাড়পত্র নিতে বিজিএমইএকে অনুরোধ করেছে। সংগঠনের মহাসচিব ফারহান নূর জানান, আগের নির্দেশনা বহাল থাকায় পেট্রোবাংলার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ গ্যাস আইন, ২০১০-এর ১১ ধারায় অনুমোদিত সংযোগের গ্যাস অননুমোদিত উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। আইনের ১১(২)(খ) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সিএনজি শ্রেণিভুক্ত গ্রাহক তার অনুমোদিত সংযোগ থেকে অননুমোদিত বা অবৈধভাবে বাণিজ্যিক কাজে, গৃহস্থালি কাজে, শিল্প প্রতিষ্ঠানে বা বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ ছয় মাস কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি হলে ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ খাতেও প্রভাব পড়েছে এবং লোডশেডিং বেড়ে ৯৬২ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনাও গ্যাস সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।




