বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘ ২১ মাস পর নীতি সুদহার (রেপো রেট) হ্রাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত মনিটারি পলিসি কমিটির (এমপিসি) ১৩তম সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। নতুন নির্ধারিত নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। আগামী ২ আগস্ট থেকে এই হার কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, দেশীয় বিনিয়োগের গতি, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, কর্মসংস্থান পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সামগ্রিক চিত্র। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ গত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ক্ষমতার রদবদল এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে গত চার-পাঁচ বছর ধরে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা বিরাজ করছে। এর ফলে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ বা বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না এবং তারা দীর্ঘদিন ধরে ঋণের সুদের হার কমানোর দাবি জানিয়ে আসছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নীতি সুদহার কমানোর ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কম সুদে ধার নিতে পারবে, যা শেষ পর্যন্ত গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সুদের হার কমাতে সহায়তা করবে। এর ফলে বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে। পাশাপাশি, বিবিএসের সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি; প্রতি তিনজন স্নাতকের মধ্যে একজন বেকার। দেশে বর্তমানে প্রায় ৯ লাখ শিক্ষিত বেকার রয়েছে, যা ২০১৭ সালের তুলনায় দ্বিগুণ।
এর আগে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ধারাবাহিক ১১ দফায় নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করেছিল। অতিরিক্ত চাহিদা নিয়ন্ত্রণ ও মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্যে দীর্ঘদিন এই হার অপরিবর্তিত রাখা হয়। তবে প্রত্যাশিত মাত্রায় মূল্যস্ফীতি কমেনি। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে ছিল, যদিও লক্ষ্য ছিল সাড়ে ৭ শতাংশের নিচে নামানো। চলতি অর্থবছর শেষে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পরই নীতি সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেন, তবে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর সেটি স্থগিত রাখা হয়। গত ৩০ জুন চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়। এবারের এমপিসি সভায় নীতি সুদহার কমানোর পাশাপাশি স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) রেট ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১১ শতাংশ করা হয়েছে। তবে স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) রেট ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। সভায় ডেপুটি গভর্নর মো. হাবিবুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা কামাল মুজেরী, বিআইডিএসের মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক, প্রধান অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ আখতার হোসেন ও নির্বাহী পরিচালক ইমাম আবু সাঈদ উপস্থিত ছিলেন।




