জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান প্রেক্ষাপটে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনের বড় গাছগুলোর টিকে থাকার কৌশল নিয়ে চমকপ্রদ তথ্য এসেছে একটি নতুন গবেষণায়। মালয়েশিয়ার সাবাহ অঞ্চলের কাবেলি–সেপিলক ফরেস্ট রিজার্ভে পরিচালিত এ গবেষণায় ডিপ্টেরোকার্প প্রজাতির গাছের খরা সহনশীলতার রহস্য উন্মোচন করেছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণাটি সম্প্রতি বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্সে প্রকাশিত হয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটার ও সাউথইস্ট এশিয়া রেইনফরেস্ট রিসার্চ পার্টনারশিপের গবেষকেরা যৌথভাবে এটি পরিচালনা করেন।

দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ধারণা ছিল, উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গাছের পানিপ্রাপ্তি কঠিন হয়ে পড়ে। অভিকর্ষ ও নালির ঘর্ষণ পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে খরার সময় বড় গাছগুলোর শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি থাকে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। এই গবেষণায় ৩৮টি ডিপ্টেরোকার্প গাছের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়। এগুলোর উচ্চতা ছিল ৭.৭ মিটার থেকে ৭১ মিটারের বেশি। সবচেয়ে বড় গাছটির উচ্চতা যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যাচু অব লিবার্টির প্রায় তিন-চতুর্থাংশের সমান।

গবেষণার জন্য পেশাদার গাছে চড়িরা সূর্য ওঠার আগেই বিশাল গাছের ডালে চড়ে বসেন। সারাদিন ধরে বিভিন্ন উচ্চতা থেকে পাতা, ডাল ও কাণ্ডের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে গাছের পানি পরিবহনের ২৫টি বৈশিষ্ট্য পরিমাপ করা হয়। ক্রান্তীয় অঞ্চলের বড় গাছের ওপর এটি এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় জলবাহী প্রক্রিয়াসংক্রান্ত গবেষণা।

গবেষণায় দেখা গেছে, বড় গাছগুলো তাদের কাণ্ডের নিচের দিকের পানি পরিবহনের নালি বা জাইলেম ভেসেল তুলনামূলক বেশি চওড়া করে গড়ে তোলে। চওড়া নালির কারণে পানি প্রবাহে ঘর্ষণ কমে যায় এবং পানি দ্রুত ও সহজে উঁচুতে উঠতে পারে। একই সঙ্গে উচ্চতার দিকে পাতাগুলো কম পানির চাপে কাজ করার ক্ষমতা অর্জন করে। ফলে অল্প পানি পেলেও কোষের কার্যক্রম অক্ষুণ্ন থাকে। এই দুই শারীরিক অভিযোজনের মাধ্যমেই তারা উচ্চতার প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে ওঠে।

২০২৩ ও ২০২৪ সালের তীব্র এল নিনো খরা এই গবেষণার সত্যতা যাচাইয়ের বড় সুযোগ এনে দেয়। খরায় বনের পানির স্তর অনেক নেমে গিয়েছিল। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয়, বড় গাছগুলোর বৃদ্ধির গতি একটুও কমেনি। ছোট গাছের মতোই তারা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠেছে। গবেষকেরা নিশ্চিত করেছেন, ডিপ্টেরোকার্প প্রজাতির গাছের খরা সহনশীলতার সঙ্গে তাদের উচ্চতার কোনো সম্পর্ক নেই।

এই আবিষ্কার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রেইনফরেস্টগুলোয় ডিপ্টেরোকার্প প্রজাতির গাছের আধিক্য রয়েছে। এই বিশাল গাছগুলো বিপুল পরিমাণ কার্বন ধরে রাখে, যা জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। নতুন গবেষণা প্রমাণ করছে যে পুরোনো বনগুলোর স্থিতিস্থাপকতা আগের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি। পরিবেশগত চাপের মুখে তারা নিজেদের গঠনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে টিকে থাকতে সক্ষম। ফলে এই বনাঞ্চলগুলোর সংরক্ষণ আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।

সংবাদ সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া