আজকের চিরচেনা ফল ও সবজিগুলো হাজার বছর আগে দেখতে ও স্বাদে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। মানুষের বেঁচে থাকার তাগিদে বুনো জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করা সেই আদিম উদ্ভিদগুলো কৃষকের নিরলস প্রচেষ্টায় নতুন রূপ পেয়েছে। গ্রীষ্মের তরমুজ বা শীতের ভুট্টা যখন আমরা খাই, তখন জেনে রাখা ভালো—এগুলো সব সময় এত মিষ্টি ও রসালো ছিল না। প্রাকৃতিক নির্বাচনী প্রজননের মাধ্যমে মানুষ যুগে যুগে তার প্রিয় ফসলের জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়েছে। জিএমও প্রক্রিয়ায় ব্যাকটেরিয়ার জিন ব্যবহার করে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য তৈরি হলেও কৃষকেরা ধীর গতিতে আরেকটি পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন—সিলেকটিভ ব্রিডিং। এই পদ্ধতিতে ভালো বৈশিষ্ট্যযুক্ত ফসল বেছে নিয়ে চাষ করা হয়। কলা, বেগুনসহ অনেক খাবার চাষ শুরুর আগে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সপ্তদশ শতাব্দীর ইতালীয় চিত্রশিল্পী জিওভানি স্টাঞ্চির একটি চিত্রকর্মে দেখা যায়, তখনকার তরমুজের ভেতরের অংশ সম্পূর্ণ লাল নয়, বরং ঘূর্ণমান বৃত্তাকার খাঁজযুক্ত। সময়ের সঙ্গে নির্বাচনী প্রজননে তরমুজের লাল অমরা বা প্লাসেন্টা বেড়েছে। ছবির কালো বীজগুলো প্রমাণ করে তরমুজটি পাকা ছিল। বুনো কলায় ছিল বড় ও শক্ত বীজ। পাপুয়া নিউগিনি ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অন্তত ৭ থেকে ১০ হাজার বছর আগে প্রথম কলা চাষ শুরু হয়। মুসা অ্যাকুমিনাটা ও মুসা বালবিসিয়ানার সংকরায়নের মাধ্যমে আধুনিক কলায় ছোট বীজ, সহজে ধরা ও খোসা ছাড়ানোর সুবিধা এসেছে। বেগুনের ইতিহাসেও বৈচিত্র্য দেখা যায়। প্রাচীন চীনে প্রথম বেগুন চাষ হলেও আদিম বেগুনে ডাল বা বোঁটার সংযোগস্থলে কাঁটা থাকত। নির্বাচনী প্রজনের ফলে সেই কাঁটা দূর হয়েছে, ফলে আজ আমরা ডিম্বাকৃতি বেগুনি বেগুন পাই। গাজরের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা। দশম শতাব্দীর পারস্য ও এশিয়া মাইনরে গাজর ছিল বেগুনি বা সাদা, পাতলা ও দ্বিমুখী কাঁটাযুক্ত। পরবর্তীতে তা কমলা রঙের, বড় ও মিষ্টি গাজরে রূপান্তরিত হয়। উত্তর আমেরিকার মিষ্টি ভুট্টা নির্বাচনী প্রজননের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। টিওসিন্ট নামক বুনো ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ থেকে তৈরি এই ভুট্টা খ্রিষ্টপূর্ব ৭০০০ অব্দে চাষ শুরু হয়। সেই আদিম ভুট্টা কাঁচা আলুর মতো শক্ত ও শুকনো ছিল। বর্তমান ভুট্টা ৯ হাজার বছর আগের চেয়ে প্রায় ১ হাজার গুণ বড়, চাষ ও খোসা ছাড়ানো সহজ। জেমস কেনেডির তথ্য অনুযায়ী, আদিম ভুট্টায় মাত্র ১.৯ শতাংশ চিনি ছিল, এখন তা ৬.৬ শতাংশ। এই পরিবর্তনের অর্ধেক পঞ্চদশ শতাব্দীর পর ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারীদের হাতে ঘটে। পিচফলের বুনো সংস্করণ চেরি ফলের মতো ছোট ও সামান্য মাংসল ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০০ অব্দে চীনারা প্রথম এর চাষ শুরু করে। কেনেডির মতে, আদিম পিচফলের স্বাদ মাটির মতো ও কিছুটা নোনতা ছিল। হাজার বছরের প্রজননে আধুনিক পিচফল আদিম ফলের চেয়ে ৬৪ গুণ বড়, ২৭ শতাংশ বেশি রসালো ও ৪ শতাংশ বেশি মিষ্টি হয়েছে।
আদিম যুগে কেমন ছিল আমাদের চেনা ফল ও সবজি
মানুষের হাজার বছরের নির্বাচনী প্রজননের ফলে আদিম যুগের তরমুজ, কলা, বেগুন, গাজর, ভুট্টা ও পিচফলের চেহারা ও স্বাদ পুরোপুরি বদলে গেছে। বুনো ফল ও সবজি আজকের সুস্বাদু, রসালো ও বড় আকারের খাদ্যে পরিণত হয়েছে।




