মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের চিত্র বদলে যাচ্ছে। পাঁচ বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর সামরিক জান্তা আবারও বলগা ফিরে পেয়েছে। বিপরীত পক্ষে থাকা গণতন্ত্রকামী পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের (পিডিএফ) যোদ্ধারা পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে। সাগাইং অঞ্চলের একটি গোপন ঘাঁটিতে পিডিএফের এক সেকশন কমান্ডার জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিপ্লব দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিয়েছে। নিরাপত্তার কারণে ‘ভিলেন’ নামধারী এই তরুণ যোদ্ধার মতে, কয়েক বছর আগে আন্দোলনে যোগ দেওয়া সৈন্যদের মধ্যেও এখন সন্দেহ ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। তারা বিপ্লবের সফলতা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।
২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির সরকারকে উৎখাতের পর মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এসিএলইডির তথ্য অনুসারে, এখন পর্যন্ত এই সংঘাতে এক লাখের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এক সময় বিদ্রোহীরা জান্তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু চীনের সরাসরি সমর্থনে জান্তা বাহিনী রণক্ষেত্রে নতুন করে আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেছে। বেইজিং দুটি শক্তিশালী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী—মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (এমএনডিএএ) এবং তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ)—এর সঙ্গে জান্তার যুদ্ধবিরতি করিয়ে দিয়েছে। ফলে পিডিএফ যোদ্ধারা এখন তাদের সবচেয়ে কার্যকরী মিত্রদের হারিয়ে পিছু হটছে। তাদের কাছে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা, অস্ত্র ও গোলাবারুদের অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে চীনের কৌশলগত ভূমিকা। শুরুতে বেইজিং অভ্যুত্থান নিয়ে হতাশ ছিল, কিন্তু পরে তারা জান্তার নবগঠিত বেসামরিক প্রশাসনকে সমর্থন দিতে শুরু করে। জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং যখন নির্বাচনের মাধ্যমে বেসামরিক শাসনে ফেরার প্রতিশ্রুতি দেন, তখন চীন তাকে পূর্ণ সমর্থন দেয়। গত এপ্রিলে মিন অং হ্লাইং বেসামরিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। যদিও গণতন্ত্রকামী পর্যবেক্ষকেরা এই নির্বাচনকে উপহাস বলে আখ্যা দিয়েছেন, চীন একে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার লক্ষণ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। সম্প্রতি জান্তা প্রধান ভারত, লাওস ও চীনে রাষ্ট্রীয় সফর করেছেন এবং লালগালিচা সংবর্ধনা পেয়েছেন। আগামী রোববার ব্যাংককে তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসিয়ান জোটের ১১ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। অভ্যুত্থানের পর থেকে আসিয়ান জান্তাকে অনেকটা একঘরে করে রেখেছিল, কিন্তু এখন সেই নীতি পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
বিশ্বমঞ্চে মিয়ানমারের গণতন্ত্রকামী পক্ষ ক্রমেই গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে। নির্বাসিত ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টের (এনইউজি) পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিন মার অং স্বীকার করেছেন, জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন হারানো তাদের জন্য একটি বড় ধাক্কা। তাঁর মতে, কেউ একা যুদ্ধ জিততে পারে না। তিনি আরও বলেন, পাঁচ বছর ধরে কূটনৈতিক অচলাবস্থা দেখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন হতাশায় ভুগছে এবং জান্তার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, রণক্ষেত্রে জয়লাভ করতে পারলে এবং একতা প্রমাণ করতে পারলে বিশ্ব তাদের প্রতি সমর্থন ফিরিয়ে আনবে।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক মর্গান মাইকেলসের মতে, পিডিএফ যোদ্ধারা মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য কেবল বিরক্তির কারণ, কোনো বড় কৌশলগত হুমকি নয়। তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী, জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন ছাড়া অসংগঠিত পিডিএফ যোদ্ধারা হয় যুদ্ধবিরতিতে যাবে, নয়তো ‘আঞ্চলিক যুদ্ধবাজ’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে অথবা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। অন্যদিকে জান্তা সরকার নতুন শান্তি পরিকল্পনা উপস্থাপন করছে, সু চিকে কারাগার থেকে গৃহবন্দী অবস্থায় সরিয়ে নিচ্ছে এবং সুযোগ বুঝে যুদ্ধবিরতি সই করছে। মাইকেলস বলেন, এই উদ্যোগগুলো হয়তো সম্পূর্ণ আন্তরিক নয়, কিন্তু বিরোধীদের তুলনায় জান্তা কিছুটা বেশি এগিয়ে আছে বলেই তারা সাফল্য পাচ্ছে।
সমগ্র পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিদ্রোহীরা বর্তমানে এক কঠিন অবস্থার মুখোমুখি। তাদের মধ্যে অনেকে মনে করছেন, তারা রাজনৈতিকভাবে পরাজিত হয়েছে এবং চীনের চাপের কারণেই এই পিছু হটা। তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির একজন যোদ্ধা জানান, মূল বিষয় ছিল চীনের চাপ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জান্তার পুনরুত্থান এবং বিদ্রোহীদের পিছু হটা কি চূড়ান্ত? নাকি বিপ্লবীরা আবার সংগঠিত হয়ে ফিরে আসতে পারবে? তবে বর্তমান ধারা যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে মিয়ানমারের গণতন্ত্রকামী আন্দোলনের ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।




