অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়া দ্বীপের শহরগুলোতে বর্তমানে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এক বিশালকায় প্রাণী। 'নীল' নামের পাঁচ বছর বয়সী একটি এলিফ্যান্ট সিলের ওজন প্রায় এক টন। রাস্তার ব্যারিকেড, বেড়া ভেঙে ফেলা, মাঝরাস্তায় শুয়ে পড়ে যানজট সৃষ্টি করা, এমনকি পার্কিংয়ে থাকা গাড়িতেও ধাক্কা দেওয়া—এসবই তার নিত্যদিনের কাজ। তবে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, রাগের কারণে নীল এসব করছে না; বরং এটি তার খেলার অংশ। ওর আচরণ অনেকটা এক অবাধ্য কিশোরের মতো। নীলের এই বিশাল দেহের ধাক্কায় রাস্তার ট্রাফিক কোণ ও বড় গাড়িগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাসমানিয়ার মেয়র রড ম্যাকডোনাল্ড জানান, নীল দ্রুত দৌড়াতে না পারলেও তার ওজন এত বেশি যে কোনো গাড়ির ওপর চাপ পড়লে বা ধাক্কা লাগলে সেটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। তবে এসব সত্ত্বেও স্থানীয়দের কাছে নীল বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সিনেটর জ্যাকি ল্যাম্বি মজা করে বলেন, নীল এমন এক প্রাণী যে পুরো রাস্তা আটকে জ্যাম তৈরি করতে পারে, কাউকেই গ্রাহ্য করে না, অথচ মানুষের মন জয় করে নেয়।
তাসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সিল বিশেষজ্ঞ ডক্টর জেন ইয়ংগার জানান, নীল আসলে তার প্রজাতির স্বাভাবিক আচরণই করছে। এলিফ্যান্ট সিলরা সাধারণত লোম ও চামড়ার ওপরের স্তর ঝরাতে বা প্রজনন মৌসুমে বছরে কয়েকবার তাদের জন্মস্থানে ফিরে আসে। কিন্তু নীলের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটেছে। তার প্রজাতির অন্যান্য সিলরা হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে অ্যান্টার্কটিকার বরফে ঢাকা অঞ্চলে থাকে, কিন্তু নীল মানুষের লোকালয়ে চলে এসেছে। ছোটবেলা থেকেই সে প্রতিবছর তাসমানিয়ার বিভিন্ন শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং সেখানেই বড় হয়েছে। বর্তমানে তার ওজন ১ হাজার কেজি। তবে এটি শেষ নয়; প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সিলদের ওজন সাধারণত ২ থেকে সাড়ে ৩ টন পর্যন্ত হতে পারে, অর্থাৎ নীল ভবিষ্যতে এখনকার চেয়ে আরও তিন গুণ বড় ও ভারী হবে।
ডক্টর ইয়ংগারের মতে, নীলের বাবা-মা হয়তো ছোটবেলায় পথ ভুল করে তাসমানিয়ায় চলে আসেন এবং সেখানেই নীলের জন্ম হয়। সাধারণত এলিফ্যান্ট সিলরা বছরে কয়েকবার ডাঙায় উঠে বিশ্রাম নেয়। নীলও হয়তো সপ্তাহখানেকের জন্য লোকালয়ে এসেছে। স্বাভাবিক নিয়মে ওর বয়সী অন্যান্য পুরুষ সিলদের সঙ্গে খেলাধুলা ও মারামারি করে বড় হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু শহরে তো আর কোনো সিল নেই। তাই সে রাস্তার খুঁটি, ট্রাফিক কোণ ও বেড়ার সঙ্গেই মারামারি করে। মূলত অন্য কোনো বন্ধু না থাকায় নীল খুব একা বোধ করছে। এলিফ্যান্ট সিলের স্বভাব হলো তারা সবাই মিলে একে অপরের গায়ে ঘেঁষে ঘুমায়, কিন্তু নীল এখানে একদম একা। তাই ঘুমানোর সময় সে কোনো বেড়া বা শক্ত জিনিসের সঙ্গে গা ঘেঁষে শুয়ে থাকে।
নীলের প্রজাতি দক্ষিণী এলিফ্যান্ট সিল বর্তমানে বড় বিপদের মুখে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (আইইউসিএন) এদের সংকটাপন্ন বা বিপন্ন প্রাণী হিসেবে ঘোষণা করেছে। কারণ বার্ড ফ্লু নামের একটি মারাত্মক রোগ সিলদের কলোনিতে ছড়িয়ে পড়ায় অ্যান্টার্কটিকার একটি দ্বীপেই প্রায় ১৩ হাজার সিল ছানা মারা গেছে। নীল যখন শহরে আসে, তখন স্থানীয় মানুষ ওর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। তবে ওর বিশাল শরীরের ধাক্কায় জিনিসপত্র ভেঙে যাওয়ার ভয় থাকে। তাই বন্যপ্রাণী কর্মকর্তারা সবাইকে নীল থেকে অন্তত ২০ মিটার দূরে থাকতে বলেছেন, এমনকি ঘুমানোর সময়ও। আর সঙ্গে কুকুর থাকলে অন্তত ৫০ মিটার দূরে থাকা প্রয়োজন। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, নীলের মতো একটি বন্য প্রাণী শহরে আসায় মানুষের বিরক্ত হওয়া উচিত নয়। পরিবেশ সুন্দর রাখলে নীলের মতো প্রাণীরাও ভালো থাকবে এবং এই সুযোগে এলিফ্যান্ট সিল ও সমুদ্রের জীবন সম্পর্কে নতুন ও অজানা তথ্য জানার সুযোগ তৈরি হয়েছে।




