কৌশলগত কারণে চীন এখন মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে একাধিক বিকল্প পথ গড়ে তুলছে। ২০০৩ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও প্রথম ‘মালাক্কা দ্বিধা’ বা মালাক্কা ডিলেমার বিষয়টি উত্থাপন করেন। মালয় উপদ্বীপ ও সুমাত্রা দ্বীপের মাঝে অবস্থিত এই সংকীর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে চীনের আমদানি করা তেল ও পণ্যের বড় একটি অংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এতে কোনো বিঘ্ন ঘটলে দেশটির অর্থনীতি মারাত্মক চাপের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের এই অঞ্চলে নৌ-উপস্থিতি সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে সম্পূর্ণ অবরোধের সম্ভাবনা কম। এই বাস্তবতা মোকাবিলাতেই চীন ‘করিডর-হেজিং’ নামে একটি কৌশল গ্রহণ করেছে, যেখানে সমুদ্রপথকে সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপন না করে বরং এর পাশাপাশি একাধিক স্থলপথ, পাইপলাইন ও রেলপথ গড়ে তোলা হচ্ছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যে সমুদ্রপথের গুরুত্ব এখনও অপরিসীম, কারণ একটি মাত্র বড় জাহাজ বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহনে সক্ষম, যা স্থলপথে পরিবহনের জন্য বহু ট্রেন বা ট্রাকের প্রয়োজন হয়। কিন্তু চীন মনে করে, সংকটের সময় বিকল্প পথ থাকলে সরবরাহব্যবস্থা তুলনামূলক বেশি স্থিতিশীল রাখা সম্ভব।চীন–মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর (সিএমইসি) এই কৌশলের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। রাখাইনের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে সড়ক, রেল ও পাইপলাইনের মাধ্যমে ইউনান প্রদেশকে যুক্ত করার প্রকল্পটি মালাক্কা প্রণালি এড়িয়ে জ্বালানি আনার সুযোগ তৈরি করছে। একইভাবে চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) গওয়াদর বন্দরকে পশ্চিম চীনের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে, যা আরব সাগর থেকে পণ্য পরিবহনের বিকল্প পথ হতে পারে। সম্প্রতি চীন বাংলাদেশের কাছে একটি ত্রিপক্ষীয় ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর’ (সিএমবিইসি) গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে, যা তার বৃহত্তর কৌশলেরই অংশ। এ ছাড়া তুর্কমেনিস্তান, কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তান থেকে মধ্য এশিয়া হয়ে চীনে আসা প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইনও এই নেটওয়ার্কের অন্তর্ভুক্ত।চীনের নীতিনির্ধারকরা জানেন, আগামী কয়েক দশকেও সমুদ্রপথের কোনো বিকল্প তৈরি সম্ভব নয়। তাই তারা নতুন কোনো ‘সুপার করিডর’ নির্মাণ না করে বরং এমন একটি সংযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে চান যেখানে একাধিক পথ একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। কোনো অঞ্চলে সংঘাত শুরু হলে একটি পথের ব্যবহার কমলে অন্যটির গুরুত্ব বাড়বে। আবার সমুদ্রপথ স্বাভাবিক থাকলে স্থল করিডরগুলো সীমিত পরিসরেই ব্যবহৃত হবে। এই নমনীয়তাই ‘করিডর-হেজিং’ কৌশলের মূল শক্তি। ভবিষ্যতে কৌশলগত সুবিধা নির্ভর করবে কার হাতে সবচেয়ে বেশি কার্যকর বিকল্প পথ রয়েছে, তার ওপর—একসময়ে বলা হতো সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে, কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে সেই সমীকরণ বদলাচ্ছে। এখন সাফল্য নির্ভর করছে সংকটের মধ্যেও সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার সক্ষমতার ওপর।
মালাক্কা দ্বিধা মোকাবিলায় বিকল্প সংযোগপথ তৈরি করছে চীন
চীন মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে ‘করিডর-হেজিং’ কৌশল গ্রহণ করছে। সমুদ্রপথের বিকল্প নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে একাধিক স্থলপথ ও পাইপলাইন তৈরি করছে যাতে সংকটের সময় সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা যায়।



