এমন কিছু অনন্য ভৌগোলিক অবস্থান পৃথিবীতে আছে, যেখানে পা রেখে দৃষ্টি ফেরালেই দেখা মেলে তিনটি স্বতন্ত্র দেশের। এই বিশেষ বিন্দুগুলোকে ভূগোলের পরিভাষায় অভিহিত করা হয় ট্রাইপয়েন্ট (Tripoint) নামে। সারা বিশ্বে প্রায় ১৭৬টি আন্তর্জাতিক ট্রাইপয়েন্ট বিদ্যমান। এই তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করছে চীন, দেশটির সীমান্তবর্তী এলাকায় ১৬টি ট্রাইপয়েন্ট চিহ্নিত করা যায়। এর পরেই রয়েছে রাশিয়া, যার ১৪টি সীমান্ত-মিলনবিন্দু আছে। ৯টি ট্রাইপয়েন্টের অধিকারী হয়ে তৃতীয় স্থান দখল করেছে অস্ট্রিয়া।
এমনই পাঁচটি সুপরিচিত ট্রাইপয়েন্টের বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
দক্ষিণ আমেরিকার ‘ট্রিপল ফ্রন্টিয়ার’ একইসঙ্গে প্রকৃতি ও ভূ-রাজনীতির এক চমৎকার সংযোগস্থল। ইগুয়াসু ও পারানা নদীর সঙ্গমস্থলেই ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়ের সীমানা একীভূত হয়েছে। নদীর তীরে তিন দেশের জাতীয় পতাকাসম্বলিত স্মৃতিস্তম্ভ ও নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে প্রতিবছর এখানে প্রচুর ভ্রমণপিপাসু সমাগম ঘটে।
ইউরোপের অন্যতম সুপরিচিত ট্রাইপয়েন্টের নাম ড্রিল্যান্ডেনপাঙ্কট। নেদারল্যান্ডসের ভালসারবার্গ পাহাড়ের সর্বোচ্চ বিন্দুতে অবস্থিত এই স্থানে একটি প্রস্তরখণ্ড নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম ও জার্মানির সীমান্ত-মিলন নির্দেশ করে। এখানকার বৃত্তাকার বেঞ্চে উপবিষ্ট হয়ে দর্শনার্থীরা একই মুহূর্তে তিন দেশের দিকে তাকিয়ে থাকার বিরল অনুভূতি লাভ করেন। আশপাশে একটি গোলকধাঁধা, পর্যবেক্ষণ মিনার ও পদচারণার মনোরম পথও আছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ নামে সুপরিচিত ট্রাইপয়েন্টটি থাইল্যান্ড, লাওস ও মিয়ানমারের সীমান্তের মিলনস্থল। রুয়াক নদী যেখানে মেকং নদীর সঙ্গে মিশেছে, ঠিক সেখানেই এই তিন রাষ্ট্রের সীমানা এক বিন্দুতে পরিণত হয়েছে। থাইল্যান্ডের চিয়াং রাই প্রদেশের একটি দর্শন-বিন্দু থেকে মেকংয়ের অপর পাড়ে লাওস ও মিয়ানমারের পাহাড় স্পষ্ট দৃষ্টিগোচর হয়। ছোট জলযানে করেও নদী পরিভ্রমণের সুযোগ রয়েছে, যদিও প্রতিবেশী দেশে প্রবেশ করতে চাইলে ভিসা ও সীমান্তসংক্রান্ত বিধি যথাযথভাবে পালন করতে হয়।
সুইজারল্যান্ডের বাসেল শহরের নিকটে রাইন নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত ড্রেইল্যান্ডারেক নামক ট্রাইপয়েন্টটি একটি বিশাল লৌহস্তম্ভ দিয়ে চিহ্নিত, যেখানে তিনটি দেশের পতাকার প্রতীক খোদিত রয়েছে। এখানে অল্প কিছু পথ হাঁটলেই সুইজারল্যান্ড, জার্মানি ও ফ্রান্সের সীমান্ত পার হওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করা সম্ভব।
উত্তর ইউরোপের গোল্ডায়ারভি হ্রদের মধ্যভাগে নরওয়ে, সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের সীমান্ত একীভূত হয়েছে। হলুদ বর্ণের কংক্রিটের তৈরি একটি স্মারকস্তম্ভ এই ‘থ্রি কান্ট্রি কেয়ার্ন’-এর অবস্থান নির্দেশ করে। শীতের মৌসুমে হ্রদের জলরাশি জমে কঠিন বরফে পরিণত হলে পর্যটকেরা হেঁটেই ট্রাইপয়েন্টে পৌঁছে যেতে পারেন, তবে গ্রীষ্মকালে সেখানে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম নৌকা। নর্ডিক অঞ্চলের অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও শীতে দৃশ্যমান মেরুজ্যোতি (অরোরা) এই স্থানটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
উল্লিখিত স্থানগুলো ছাড়াও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি-স্লোভাকিয়ার ট্রাইপয়েন্ট এবং আফ্রিকার জাম্বিয়া-জিম্বাবুয়ে-বতসোয়ানার জাম্বেজি নদীসংলগ্ন মিলনবিন্দুও বেশ প্রসিদ্ধ। ইতিহাসের ভিন্ন ভিন্ন পর্বে কখনো কখনো একই বিন্দুতে চার বা পাঁচটি দেশের সীমান্ত মিলিত হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক সীমান্ত চুক্তির বিবর্তনে সেই বহুদেশীয় সীমানাগুলো আর টিকে থাকেনি।




