২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া বেশ কয়েকজন ব্যক্তির বর্তমান অবস্থা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তৈরি হয়েছে এই প্রতিবেদন। দুই বছর পর তাঁদের জীবন অনেকটাই স্বাভাবিক ছন্দে ফিরলেও অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে তাঁদের মধ্যে হতাশা দেখা গেছে।
শায়লা আক্তার শশী এখন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। ২০২৪ সালের ২ আগস্ট উত্তরার রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ প্রাঙ্গণে ঝুম বৃষ্টির মধ্যে রিকশায় বসে স্লোগান দেওয়ার ছবি ভাইরাল হয়েছিল তাঁর। ওই দিন কলেজের এক শিক্ষার্থীকে আটক ও নির্বিচার গুলি-খুনের প্রতিবাদে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। বর্তমান প্রসঙ্গে শায়লা বলেন, ‘যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে মানুষ জীবন দিয়েছিল, সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলো এখনো নিজেদের স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত। জুলাইয়ের শহীদদের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি, অনেক আহত ব্যক্তিকে নিজের খরচে চিকিৎসা করাতে হচ্ছে।’ তাঁর মতে, ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য যে আত্মত্যাগ, এখনো সেই একই ব্যবস্থায় ঘুরপাক খাচ্ছে দেশ।
স্যানিটারি মিস্ত্রি মো. নাসির খানের ছবিও আলোচিত হয়েছিল—৪ আগস্ট কারওয়ান বাজারে টিনের তৈরি ঢাল নিয়ে পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। সে সময় তাঁর কপালে ও হাতে ছররা গুলি লাগে। নাসির জানান, কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দেখে বিবেকের তাড়নায় রাস্তায় নেমেছিলেন। তিনি মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। আহত যোদ্ধাদের তালিকায় নিজের নাম না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি, তবে রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য সরকারকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া উচিত বলে মত দেন।
রায়হান মোল্লা ১৯ জুলাই উত্তরা পূর্ব থানার সামনে পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছিলেন। আহত অবস্থায় সড়ক বিভাজকের আড়ালে আশ্রয় নেওয়ার ছবি ভাইরাল হয়। তিনি এখন ব্যবসা করছেন এবং জুলাই অভ্যুত্থানের তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ করছেন। রায়হান বলেন, ‘আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, দুর্নীতি ও বৈষম্য কমানো এবং সবার সমান অধিকার নিশ্চিত হলেই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়িত হবে।’
মো. নাহিদুল ইসলাম ৩১ জুলাই ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচিতে পুলিশের হাতে আটক হন এবং তাঁর মুখ চেপে ধরার ছবি ভাইরাল হয়। বর্তমানে নাটক নির্মাণে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন নাহিদুল। তাঁর মূল্যায়ন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে একটি গোষ্ঠী কুক্ষিগত করায় অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়েছে।’ তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেন, তরুণ প্রজন্মকে লক্ষ্যে পৌঁছাতে সহযোগিতা না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও আগের পথেই চলবে।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান ওই কর্মসূচিতে পুলিশের গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তাঁর ছবি ‘মানবঢাল’ নামে পরিচিত হয়। নুসরাতের মতে, শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও ভোটাধিকার ফিরে পাওয়া ছাড়া অভ্যুত্থানের অনেক প্রত্যাশাই অপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা, নারীর নিরাপত্তা ও জুলাই সনদের বাস্তবায়নে অগ্রগতি হয়নি। তিনি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাকে সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করেন।
৫ আগস্ট ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গ থেকে নিহত ইসমাইল হোসেন রাব্বির মরদেহ কাঁধে নিয়ে মিছিল করেন দুই বোন মিতু ও মিম আক্তার। মিম এখন জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনে কর্মরত। তিনি নির্বাচিত সরকারের কাছে শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং মব ও চাঁদাবাজি দমনের কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ জুলাই ছাত্রলীগের হামলার সময় আরেক নারী শিক্ষার্থীর হাত ধরে দৌড়ান লামিয়া রায়হান। সেই ছবি ভাইরাল হয়। বর্তমানে লামিয়া বলেন, ‘বৈষম্য, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নের বড় অংশই অপূর্ণ। একটি গোষ্ঠী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করায় মানুষের আগ্রহ কমে গেছে।’ তিনি আক্ষেপ করে জানান, গত দুই বছরে তাঁর ভাইরাল ছবি ব্যবহার করা হলেও তাঁকে কখনো আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
সবাই মিলে বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঐতিহাসিক অর্জন হলেও নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে এখনো অনেক পথ বাকি। আইনের শাসন, জবাবদিহি ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলেই শহীদদের আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে বলে তাঁরা মনে করেন।




