পার্বত্য জেলা রাঙামাটি ও বান্দরবানে বন্যার প্রকোপ কমে আসায় জনজীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মানুষজন নিজ নিজ বাড়িঘরে ফিরছেন, যদিও এখনো বহু পরিবার পানিবন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে এবং ত্রাণ সহায়তা অপ্রতুল বলে ক্ষতিগ্রস্তরা অভিযোগ তুলেছেন।

রাঙামাটির প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৫০টি আশ্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে ৩ হাজার ৬৩৭ জন অবস্থান করছেন এবং ১ হাজার ৪৪টি পরিবার এখনো জলাবদ্ধতার মধ্যে আটকা পড়ে আছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রুহুল আমিন জানিয়েছেন, বৃষ্টিজনিত পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে জেলার সাতটি উপজেলার ১৩১টি স্থানে। দুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ ও বিনামূল্যে চিকিৎসা কার্যক্রম চলমান থাকলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রয়োজনের তুলনায় সাহায্য যথেষ্ট নয়।

বরকল উপজেলার ভূষণছড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম এখনো প্লাবিত বলে জানান ঠেগা খুব্বাং উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জিতেন্দ্র চাকমা। তার মতে, পানি কিছুটা কমলেও স্বাভাবিক অবস্থা ফেরেনি এবং অনেকের চাষাবাদ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। একই উপজেলার বাসিন্দা ধর্মেশ চাকমা জানালেন, দেড় লাখ টাকা ব্যয়ে করা ৫০০ পেঁপেগাছের বাগান মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে বন্যার পানিতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। জাঙেয়েছড়া গ্রামের কৃষক জগৎময় চাকমার ৮৭২টি উন্নত জাতের পেঁপেগাছও একই পরিণতি বরণ করেছে, যার পেছনে ব্যয় হয়েছিল ১ লাখ ৪২ হাজার টাকা।

বরকল উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিমের বরাতে জানা যায়, কেবল ভূষণছড়া ইউনিয়নেই ৪৪টি গ্রামের প্রায় ৪ হাজার বাসিন্দা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং ফসলি জমি, শাকসবজি খেত ও আমনের বীজতলার বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নের বহু গ্রামও এখনো জলের নিচে। তবে ইউএনও মো. জাকির হোসেন নিশ্চিত করেছেন যে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে সরকারি ত্রাণ ও বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ অব্যাহত আছে।

অপরদিকে বান্দরবানে নদীর পানি কমে যাওয়ায় বাসিন্দারা ঘরে ফিরতে শুরু করলেও সড়ক যোগাযোগ এখনো বিঘ্নিত। জেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম জানিয়েছেন, পাহাড় থেকে ধসে পড়া মাটি সরাতে না পারায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং শীলক খালের ভেসে যাওয়া বেইলি সেতু পুনর্নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত বান্দরবান-চন্দ্রঘোনা-রাঙামাটি পথে বাস চালানো সম্ভব নয়। তবে আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়ে আসতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

জেলা শহরের বিভিন্ন পাড়া ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তাঘাট কর্দমাক্ত এবং বাড়িঘর পরিষ্কারে ব্যস্ত সময় পার করছেন ফেরত আসা মানুষজন। উজানীপাড়ার বাসিন্দা জসিম উদ্দিন জানান, ঘরভর্তি কাদা পরিষ্কারের কাজ শুরু করলেও পুরোপুরি ফিরতে আরও সময় লাগবে। বান্দরবান সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে আট দিন ধরে থাকা হনুফা বেগম বললেন, পানি নামলেও সাঙ্গু নদের উপচে পড়ার শঙ্কা এখনো কাটেনি, তাই পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরের দিন কেন্দ্র ছাড়বেন।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এস এম হাসানের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারিভাবে ইতোমধ্যে সাড়ে তিন হাজার মানুষ ত্রাণ পেয়েছে এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও সহায়তা প্রদান করছে। সামগ্রিকভাবে বান্দরবানে জীবনযাত্রা ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে আসছে।