দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে চারটি চিতাবাঘ সংগ্রহের উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। রাজধানীর মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানায় প্রাণীগুলো আনার পরিকল্পনা ছিল গত অর্থবছরে। দরপত্র আহ্বান, কার্যাদেশ ও আন্তর্জাতিক অনুমতির অধিকাংশ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও শেষ মুহূর্তে তা ভেস্তে যায়। ব্যর্থতার দায় একে অপরের ওপর চাপাচ্ছে বন বিভাগ ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ফ্যালকন ট্রেডার্স।
চিড়িয়াখানার পাঁচ বছর মেয়াদি প্রাণী সংগ্রহ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চারটি চিতাবাঘ, দুটি ওয়াইল্ড বিস্ট ও দুটি কমন ইল্যান্ড কেনার জন্য পৃথক তিনটি দরপত্র ডাকা হয়েছিল। তিনটিরই কার্যাদেশ পায় ফ্যালকন ট্রেডার্স। ওয়াইল্ড বিস্ট ও কমন ইল্যান্ড নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরবরাহ করলেও চিতাবাঘ চারটি আনতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। কার্যাদেশের শর্ত অনুযায়ী, অর্থবছর শেষ পর্যায়ে থাকায় বিল জমা দেওয়ার সময়সীমা বিবেচনা করে ২০ জুনের মধ্যে প্রাণী সরবরাহের বাধ্যবাধকতা ছিল।
চিতাবাঘ আমদানির জন্য বিপন্ন প্রজাতির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা সাইটিসের অনুমতি আবশ্যক। বাংলাদেশের বন বিভাগ এ অনুমতি প্রদান করে থাকে। ফ্যালকন ট্রেডার্সকে বাংলাদেশের বন বিভাগ থেকে সাইটিস পারমিট দেওয়া হয়েছিল। এর পরে দক্ষিণ আফ্রিকার সাইটিস কর্তৃপক্ষ পারমিটের সত্যতা যাচাই করতে বন বিভাগের কাছে ই-মেইলে জানতে চায়। তখনই জটিলতা সৃষ্টি হয়।
ফ্যালকন ট্রেডার্সের কর্ণধার মোহাম্মদ সোহেল আহমেদ জানান, তাঁদের পক্ষ থেকে সব প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার সাইটিস কর্তৃপক্ষ বন বিভাগের কাছে যাচাই-সংক্রান্ত ই-মেইল পাঠালে বন বিভাগ ১৫ থেকে ২০ দিন সময় নষ্ট করে। শেষ পর্যন্ত গত ২৩ জুন বন বিভাগ উত্তর দিলেও তত দিনে কার্যাদেশের সময়সীমা পার হয়ে যায়। অন্যদিকে বন বিভাগের দাবি, তারা ২২ জুন মেইল পেয়ে পরদিনই জবাব দিয়েছে। বন বিভাগের প্রধান বনসংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, তারা জবাব দিতে কোনো দেরি করেননি।
জাতীয় চিড়িয়াখানার প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার মো. মজিবুর রহমান বলেন, ২০ জুনের মধ্যে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান প্রাণীগুলো দিতে পারেনি, তাই কার্যাদেশটি এখন বাতিল হবে। এ ব্যাপারে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি দেখবে, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি ছিল কি না, নাকি অন্য কোনো কারণে আমদানি ব্যর্থ হয়েছে। চারটি চিতাবাঘ সরবরাহের চুক্তিমূল্য ছিল ১ কোটি ৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকা, তবে প্রতিষ্ঠান প্রাণী না দেওয়ায় সরকার কোনো অর্থ পরিশোধ করেনি। এ ছাড়া আমদানির জন্য প্রতিষ্ঠানটি ১০ লাখ টাকা জামানত জমা দিয়েছিল, যা তদন্তে গাফিলতি প্রমাণিত হলে বাজেয়াপ্ত হতে পারে, না হলে ফেরত দেওয়া হবে।
সাইটিস বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের বৈশ্বিক চুক্তি। ১৯৭৫ সাল থেকে এটি কার্যকর। বাংলাদেশ এ চুক্তিতে যোগ দেয় ১৯৮১ সালে। চিতাবাঘ সাইটিসের ‘অ্যাপেনডিক্স-ওয়ান’ তালিকাভুক্ত, অর্থাৎ এটি বিলুপ্তির হুমকির মুখে থাকায় এর বাণিজ্য কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায়। সে কারণেই আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়।
একই সময়ে পৃথক দরপত্রের আওতায় দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দুটি ওয়াইল্ড বিস্ট ও দুটি কমন ইল্যান্ড সফলভাবে আনা সম্ভব হয়েছে। এই দুটি প্রাণী সাইটিসের অ্যাপেনডিক্স-ওয়ানের আওতায় না পড়ায় আমদানিতে তেমন কড়াকড়ি নেই। ওয়াইল্ড বিস্ট দুটির দাম ১১ লাখ ৯১ হাজার টাকা এবং কমন ইল্যান্ড দুটির দাম ৩৩ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। আগে চিড়িয়াখানায় দুটি স্ত্রী ওয়াইল্ড বিস্ট ও একটি স্ত্রী কমন ইল্যান্ড ছিল। এখন একটি করে পুরুষ যোগ হওয়ায় ওয়াইল্ড বিস্টের সংখ্যা চার ও কমন ইল্যান্ডের সংখ্যা তিন হয়েছে।



