ব্যবসায়ী এবং প্রবাসীদের ব্যক্তিগত মুঠোফোন নম্বরে সরাসরি ফোন করে লাখ থেকে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবির একটি সুসংহত নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন, যিনি ডেভিড ইমন নামেই সর্বাধিক পরিচিত। ভয়াবহ এই চাঁদাবাজির পুরো প্রক্রিয়াটি কয়েকটি সুসংঘবদ্ধ ধাপে সম্পন্ন হতো, যার প্রতিটি স্তরে নিয়োজিত ছিল পৃথক পৃথক ব্যক্তি।

পুলিশের সাথে কথা বলে এবং চাঁদাবাজির শিকার একাধিক নির্যাতিত ব্যক্তির সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, অর্থ সংগ্রহে একটি জটিল ও সতর্কতাপূর্ণ পদ্ধতি অনুসরণ করতো ইমনের চক্রটি। নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে টার্গেট করার পূর্বে তার আয়ের উৎস, বিদ্যমান সম্পদ ও নির্মাণাধীন ভবনের বিস্তৃত বিবরণ সংগ্রহ করা হতো। শুধু তাই নয়, লক্ষ্যবস্তু করা ব্যক্তির পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জীবনবৃত্তান্তও সংরক্ষিত হতো। এরপর একটি বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে সরাসরি ফোন করে চাঁদা দাবি করা হতো এবং অর্থ প্রদানে অস্বীকৃতি জানালে পুরো পরিবারবর্গের সম্পর্কে নিখুঁত তথ্য ফাঁস করার পাশাপাশি গুলি করে হত্যার স্পষ্ট হুমকি দেওয়া হতো।
গেল বুধবার সকালে যশোর দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় চার সহযোগীসহ ইমনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। পলাতক সভার সভার বড় সাজ্জাদের এক বিশিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে পরিচিত ইমনের বিরুদ্ধে হত্যা ও চাঁদাবাজিসহ অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তারের পরের দিনই তাকে আদালতে সোপর্দ করলে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেওয়া হয়।

চাঁদা না পাওয়ার কারণে সর্বশেষ সোমবারে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বড় দিঘিরপাড় এলাকায় এক ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিনের নির্মাণাধীন ভবনে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে ইমনের সহযোগীদের বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় মামলা দায়েরের পর চাঁদার দাবি বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ লাখ টাকায়। এর আগে, ১৩ জুলাই নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোডে অবস্থিত একটি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে ২ কোটি টাকা চাঁদার জন্য হামলা চালানোর অভিযোগ পাওয়া যায়। এই দুই আক্রমণ পর ইমনকে গ্রেপ্তারের জন্য মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জোর দাবি জানানো হতে থাকে।

চাঁদার অর্থ আদায়ের ভিন্নতর পদ্ধতি সম্পর্কে পুলিশ জানতে পেরেছে যে, নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে নির্দিষ্ট ব্যক্তির মাধ্যমে নগদ টাকা সংগ্রহ করে নেওয়া হতো। এসব অর্থবহকে আনা হতো নগরের জিইসি মোড় সংলগ্ন একটি রেস্তোরাঁয়, যেখানে ইউসুফ নামের একজন ব্যক্তি টাকাগুলো জমা নিতেন। পরবর্তীতে ইমনের নির্দেশনানুযায়ী ইউসুফ হুন্ডি অথবা কয়েকটি নির্বাচিত ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে অর্থ পাচার করতেন। ইউসুফকে এখনো পুলিশের সন্ধান অব্যহত রয়েছে, এবং তাকে ধরতে পারলে অর্থপাচারের পুরো চিত্র স্পষ্ট হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মোহাম্মদ তারেক আজিজ জানান, ইমনকে জিজ্ঞাসাবাদে প্রকাশ পেয়েছে যে, ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার কৌশল হিসেবেই নগদ লেনদেনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতো। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘তাদের একটি দল তথ্য সংগ্রহ করে, আরেকটি দল নগদ টাকা গ্রহণ করে, আরেকটি হামলা-ভাঙচুর কিংবা গুলিবর্ষণের মতো ঘটনায় জড়ায়। প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা আলাদা দল রয়েছে।’ জেলা পুলিশ সূত্রের মতে, রিমান্ডের মাধ্যমে আরও সংবেদনশীল তথ্য উন্মোচিত হতে পারে এবং ইতিমধ্যে ইমনের কাছ থেকে অস্ত্রশস্ত্রও জব্দ করা হয়েছে।

চাঁদা প্রদানকারী এক ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী, যিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, প্রথম আলোকে জানান, জুন মাসের শেষ দিকে একটি বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে ইমন তার নির্মীয়মান বহুতল ভবন ও বিভিন্ন ব্যবসা ব্যবসার দোহাই দিয়ে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। সেই সময় তার ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার অবস্থান পর্যন্ত বিস্তারিত জানিয়ে বড় ছেলেকে শেষ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। দীর্ঘ অনুণয়-বিনয়ের পর চাঁদা কমিয়ে ৫ লাখ টাকা নির্ধারিত হলে, ইমনের লোকেরাই অটোরিকশায় করে তার বাসার সামনে থেকে নগদ অর্থ সংগ্রহ করে নেয়।

ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন থেকে সরে এসে সন্ত্রাসের পথে আসার বিষয়ে ডেভিড ইমন নিজেই একবার জানিয়েছিলেন, ‘আমার ছোটবেলা থেকে ইচ্ছা ছিল বড় ক্রিকেটার হব, নয়তো বড়লোক হব। বড়লোক হওয়ার জন্য এই পথে আছি।’ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বড় সাজ্জাদের মাধ্যমে তার দলে যুক্ত হওয়ার পর, বর্তমানে সে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারী দুজন শীর্ষ নেতৃত্বের একজন। পুলিশের দাবি, এই গোষ্ঠীতে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছে।