যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার সীমিত করতে আবারও নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সুপ্রিম কোর্ট গত জুনে তাঁর আগের প্রচেষ্টা বাতিল করার কয়েক সপ্তাহ পরই এই নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হলো। বৃহস্পতিবার ওভাল অফিস থেকে দুটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন তিনি।
প্রথম আদেশটি অ-নাগরিকদের সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত করেছে যাদের সন্তানরা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাবে না। আদেশে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া কোনো শিশু স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিক হবে না যদি তার বাবা-মা উভয়েই অ-নাগরিক হন এবং তাদের মধ্যে অন্তত একজন বিদেশি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্য, বিদেশি সরকারের কর্মচারী, প্রতারণার মাধ্যমে নাগরিকত্ব অর্জনের চেষ্টাকারী, বা যুক্তরাষ্ট্রের এমন অঞ্চলে বসবাসকারী হন যেখানে ফেডারেল আইনে নাগরিকত্ব দেওয়া হয় না। উল্লেখ্য, পুয়ের্তো রিকোর মতো অঞ্চলে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব ফেডারেল আইন দ্বারা নির্ধারিত।
দ্বিতীয় আদেশটি তথাকথিত 'বার্থ ট্যুরিজম' নিষিদ্ধ করেছে। এটি এমন একটি প্রথা যেখানে গর্ভবতী মায়েরা নাগরিক সন্তান লাভের আশায় যুক্তরাষ্ট্রে এসে সন্তান জন্ম দেন। ওভাল অফিসে আদেশ ঘোষণার সময় ট্রাম্প বলেন, 'বছরের পর বছর আগেই এটি হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু আমরা এখনই এটি নিষ্পত্তি করছি।' তিনি সুপ্রিম কোর্টের আগের সিদ্ধান্তকে 'খারাপ ও খুবই অন্যায় সিদ্ধান্ত' বলে আখ্যায়িত করেন এবং উল্লেখ করেন যে তার দেশ এতে ভুগছে, তাই তারা ভিন্ন পথে এটি শেষ করছে।
হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার প্রেসিডেন্টের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, 'ধারণাটি হলো—লোকেরা পর্যটক বা দর্শনার্থী সেজে এখানে আসে। কিন্তু তাদের আসল উদ্দেশ্য হলো সন্তান জন্ম দেওয়া, সেই সন্তানকে স্বয়ংক্রিয় নাগরিক বানানো, তারপর দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক একটি সন্তান রেখে যাওয়া।' তিনি আরও বলেন, সেই শিশুরা পরে কল্যাণ সুবিধা, ভোটাধিকার এবং 'শুধুমাত্র আমেরিকানদের জন্য নির্ধারিত অন্যান্য অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা' পায়। মিলার দাবি করেন, ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্টের একটি ধারা অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের কে দেশে কে প্রবেশ করতে পারবে তা নির্ধারণের ক্ষমতা রয়েছে এবং সেখান থেকেই বার্থ ট্যুরিজম নিষিদ্ধ করার এখতিয়ার তিনি পেয়েছেন।
ননপার্টিসান গবেষণা সংস্থা মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বিস্তৃত জনশুমারি-ভিত্তিক অনুমানে বছরে প্রায় ২২,০০০ থেকে ২৬,০০০ শিশু বার্থ ট্যুরিজমের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেয়। সরকারি তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে বিদেশি ঠিকানা বিশিষ্ট মায়েদের থেকে ৯,৬০০টি সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, লাখ লাখ শিশু এভাবে জন্ম নিয়েছে।
গত বছর জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছিলেন যা মার্কিন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীতে নিশ্চিত করা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের চেষ্টা করেছিল। সেই আদেশের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত পৌঁছায় এবং জুন মাসে আদালত রায় দেয় যে ট্রাম্পের ২০২৫ সালের নীতি টিকতে পারে না এবং জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব আইন হিসেবে বহাল থাকবে। এই রায় ট্রাম্পের অভিবাসন সীমিত করার প্রচেষ্টায় বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভিস স্কুল অব ল-এর অধ্যাপক গ্যাব্রিয়েল চিন বিবিসিকে বলেছেন, আদেশের কিছু অংশ হয়তো টিকে যেতে পারে, তবে অন্যান্য দিক 'গুরুতর সাংবিধানিক প্রশ্ন উত্থাপন করে'। তিনি মনে করেন, প্রেসিডেন্টের কাছে শুধুমাত্র সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে আসা ব্যক্তিদের প্রবেশ সীমিত করার কিছু ক্ষমতা থাকলেও, 'একবার সন্তান জন্ম নেওয়ার পর, প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো ক্ষমতা নেই যে সেই শিশু নাগরিক নয়।' তিনি এই বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়েই নিষ্পত্তি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন এবং বার্থ ট্যুরিজমকে যুক্তরাষ্ট্রের লাখ লাখ জন্মের তুলনায় 'এক ফোঁটা' হিসেবে আখ্যা দেন।
ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের সদস্যরা বারবার বার্থ ট্যুরিজমের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন এবং রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রগুলোকে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সুযোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অনুপ্রবেশের অভিযোগ এনেছেন। নতুন এই নির্বাহী আদেশগুলো কার্যকর হলে তা আবারও আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকরা মত দিচ্ছেন।




