কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রযাত্রার মাঝে মানবতার ভবিষ্যৎ নিয়ে যে উদ্বেগগুলো বারবার উঠে আসছে, তার বীজ বপন করেছিলেন প্রায় ছয় দশক আগে একজন বিজ্ঞানী। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) অধ্যাপক জোসেফ ওয়াইজেনবাম ১৯৬০-এর মাঝামাঝিতে নির্মাণ করেছিলেন ‘এলিজা’ নামের বিশ্বের প্রথম চ্যাটবট। সাইকোথেরাপিস্টের ভূমিকায় অভিনয় করা এলিজা মূলত কিছু নির্দিষ্ট শব্দের ভিত্তিতে ব্যবহারকারীকে প্রশ্ন ছুড়ে দিত। অত্যন্ত সরল এই কোডিং নিয়ে ওয়াইজেনবামের ধারণা ছিল, এটি প্রযুক্তির একটি সামান্য নমুনা মাত্র।
কিন্তু বাস্তবতা তাঁকে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখায়। তাঁর নিজের সচিবও যখন এলিজার সঙ্গে কথোপকথনে মগ্ন হয়ে তাঁকে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে বলেছিলেন, তখন বিজ্ঞানী উপলব্ধি করেন — সামান্য একটি প্রোগ্রামও মানুষের মনে গভীর বিভ্রম তৈরি করতে পারে। মানুষ সহজাতভাবেই যন্ত্রের মধ্যে মানবিক গুণ খোঁজে, আর এই প্রবণতাই পরে ‘এলিজা ইফেক্ট’ নামে পরিচিত হয়। এই অভিজ্ঞতার পরই ওয়াইজেনবামের চিন্তার জগৎ বদলে যায় এবং তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভয়াবহ দিক নিয়ে সোচ্চার হতে শুরু করেন। তাঁর মতে, স্বল্প সময়ের প্রযুক্তিগত মিথস্ক্রিয়াও মানুষের মনে শক্তিশালী বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট।
সেই সময়ে জন ম্যাকার্থি বা মারভিন মিনস্কির মতো বিজ্ঞানীরা এআইয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যস্ত থাকলেও ওয়াইজেনবাম প্রশ্ন তুলেছিলেন এর নৈতিক মাত্রা নিয়ে। ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কম্পিউটার পাওয়ার অ্যান্ড হিউম্যান রিজন’-এ তিনি যুক্তি দেন, মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বিচারবুদ্ধির স্থান দখল করার ক্ষমতা প্রযুক্তির নেই। সামরিক ক্ষেত্রে এআইয়ের প্রয়োগের কঠোর বিরোধী ছিলেন তিনি। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় তিনি লক্ষ্য করেন, কম্পিউটারচালিত ব্যবস্থায় কর্মকর্তারা বোমার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করছেন, অথচ যন্ত্রের অভ্যন্তরীণ কার্যপ্রণালী সম্পর্কে তাঁদের কোনো ধারণাই নেই। এছাড়া নজরদারির কাজে এআইয়ের ব্যবহার নিয়েও গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন এই বিজ্ঞানী।
এসব বক্তব্যের কারণে সহকর্মী জন ম্যাকার্থির সঙ্গে তাঁর তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়। ম্যাকার্থি ওয়াইজেনবামের অবস্থানকে বিভ্রান্তিকর মনে করতেন। জবাবে ওয়াইজেনবাম নিজেকে এআই জগতের ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে ঘোষণা করেন। বর্তমানে চ্যাটজিপিটির মতো আধুনিক চ্যাটবটগুলো শত শত কোটি তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে উত্তর দেয়। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হার্বার্ট লিনের মতে, এলিজার সঙ্গে বর্তমান চ্যাটবটের তুলনা করা রাইট ব্রাদার্সের উড়োজাহাজের সঙ্গে বোয়িং ৭৪৭-এর তুলনার মতো। তবে ঝুঁকির মাত্রা বদলালেও মূল সমস্যাটি এখনো একই — বহু মানুষ চ্যাটবটের প্রতি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছে, আবার অনেকে মানসিক বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছে।
ওয়াইজেনবামের মেয়ে মিরাম জানান, মানুষ এখন কোড ও সংখ্যার প্রতি আসক্ত হচ্ছে এবং এই করুণ পরিণতির আভাস তাঁর বাবা আগেই পেয়েছিলেন। ২০০৮ সালে এক প্যানেল আলোচনায় মৃত্যুর আগে ওয়াইজেনবাম বলেছিলেন, আমরা এমন এক জটিল পৃথিবী তৈরি করেছি যার ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই; জটিল প্রোগ্রামগুলোর নিয়ন্ত্রণ মানুষের হাত থেকে ক্রমেই সরে যাচ্ছে। তাঁর দর্শন ছিল স্পষ্ট — মানবীয় অনুভূতির জায়গাটি যন্ত্রের দখলে যেতে পারে না। ১৯৭৬ সালে তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, যেহেতু কম্পিউটারকে প্রকৃত অর্থে জ্ঞানী করার কোনো পদ্ধতি আমাদের জানা নেই, তাই জ্ঞানভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো কম্পিউটারের ওপর ন্যস্ত করা উচিত নয়। সূত্র: স্মিথসনিয়ান ম্যাগাজিন।




