স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যে ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান ঘটে, তার দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির প্রাক্কালে ঘটনার পেছনের অনেক অজানা কথা প্রকাশ করেছেন বিএনপির মহাসচিব ও বর্তমান স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। প্রথম আলোর সঙ্গে একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি স্মরণ করেন, কীভাবে সেই দিন সেনাপ্রধানের ফোনে আলোচনার সূত্রপাত হয়েছিল।

ফখরুল জানান, সেদিন সকালে তিনি গুলশানের বাসভবনে অবস্থান করছিলেন। ছাত্রদের সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ ছিল। বেলা ১১টার দিকে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ফজলে এলাহি আকবর ফোন করে জানান যে সেনাপ্রধই তার সঙ্গে কথা বলতে চান। দুপুর ১২টার দিকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ফোন করে তাকে সেনাসদরে আসার আমন্ত্রণ জানান। সেখানে গিয়ে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। শেখ হাসিনার দেশ ত্যাগের খবরটিকে মির্জা ফখরুল এভাবে বর্ণনা করেন: "হাসিনা চলে যাচ্ছে, এটা তো একটা আমাদের কাছে অলৌকিক ঘটনা মনে হচ্ছিল। এ জন্য যে ১৭টা বছর আমরা এটার জন্য লড়াই করছি।"

আলোচনায় জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব ওঠে, কিন্তু বিএনপির নেতৃত্ব ইতিমধ্যেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষে মতামত দিয়েছিলেন। সেখানেই অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে প্রস্তাব করে ছাত্রনেতারা। ফখরুল স্পষ্ট করেন, কোনো রাজনৈতিক দল নয়, বরং ছাত্ররাই এই নামটি প্রস্তাব করে। পরবর্তীতে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে বিএনপির বৈঠকে উপদেষ্টা পরিষদের একটি তালিকা দেয়া হয়, যা নিয়ে দলের শীর্ষ নেতার সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আলোচনা করা হয়।

'মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচি এক দিন এগিয়ে ৫ আগস্ট আনার পেছনে নিজের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, "আমি মেসেজও পাঠিয়েছিলাম যে এই কর্মসূচি পেছালে এটা বাধাগ্রস্ত হয়ে যাবে এবং ব্যর্থ হতে পারে। তাই পরের দিন যেন করা যায় অর্থাৎ ৫ তারিখে যেন করা যায়।"

আন্দোলনের সময় কৌশলগত কারণে তারা সামনে না এলেও পেছন থেকে সব সমর্থন দিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে পুরো আন্দোলন জুড়ে নিয়মিত ও গোপন যোগাযোগের কথাও স্বীকার করেন ফখরুল। বলেন, "একদম কমিউনিস্ট পার্টির মতো" গাড়ি বদলে গোয়েন্দা নজরদারি ফাঁকি দিয়ে বৈঠক করা হতো।

অভ্যুত্থানের অপূর্ণতা প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, এত তাড়াতাড়ি পূর্ণতা আসবে না। ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদে দেশের সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে। সংস্কার কমিশনগুলো গঠিত হয়েছে এবং বেশিরভাগ সংস্কারই বাস্তবায়িত হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামী নেতিবাচক ভূমিকা পালন করছে বলেও সমালোচনা করেন।

শিক্ষা ও প্রশাসন ক্ষেত্রে মেধাকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বললেও দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি জবাব দেন, "এরা কিন্তু কেউ অযোগ্য না... এটা আমি বলি, অ্যান্টিফ্যাসিজম। আমি সরকারে, আমার লোকজন থাকবে না?" তিনি আরও জানান, অর্থনীতি সচল করা, প্রশাসনকে ইতিবাচক করা এবং ধর্মের ভিত্তিতে রাজনীতি করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা রোধ করাই আগামী বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে ফখরুল মন্তব্য করেন, দলটি আত্মঘাতী হয়েছে এবং এর রাজনৈতিক অস্তিত্ব আর নেই। তিনি সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে রিকনসিলিয়েশন বা পুনর্মিলনের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, এটি ছাড়া দেশকে সামনে নেওয়া যাবে না।