মাঠের লড়াই এখনও অনিশ্চিত, তবে বাণিজ্যিক দিক থেকে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বিজয়ী আগেই নিশ্চিত হয়ে গেছে—অ্যাডিডাস। ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন, আর দুই দলের জার্সিতেই রয়েছে অ্যাডিডাসের তিনটি স্ট্রাইপস। ইংল্যান্ডের সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়ার সঙ্গেই শেষ হয়ে গেছে নাইকিরও বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে নাইকি-স্পন্সরড দুটি দল লড়লেও, আসল চ্যাম্পিয়নের জার্সি নিশ্চিতভাবে অ্যাডিডাসের।
বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের টুর্নামেন্ট নয়; এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া বিপণন মঞ্চ। এখানে গোল যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ একটি জার্সির বুকে থাকা লোগো, একজন ফুটবলারের বুট কিংবা ম্যাচ শেষে বিক্রি হওয়া কোটি কোটি ডলারের মার্চেন্ডাইজ। ৪৮ দলের এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ১৪টি জাতীয় দলকে স্পন্সর করেছে অ্যাডিডাস, যেখানে নাইকির দল ছিল ১২টি। পিউমা স্পন্সর করেছে ৭টি দল। বাকি দলগুলোকে স্পন্সর করেছে উমব্রো, কেলমে, কাপ্পা, ম্যারাথন, SAETA, 7Saber, মাজিদসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ড। যত বেশি দল, তত বেশি টেলিভিশন এক্সপোজার, আর নকআউট ম্যাচে উঠলে দৃশ্যমানতা বাড়ে বহুগুণ।
ফাইনালের পরই শুরু হয় আসল খেলা। ম্যাচ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাজারে আসে 'World Champions' সংস্করণের জার্সি। তারকা-খচিত জার্সি, সীমিত সংস্করণের কালেক্টরস এডিশন, ক্যাপ, জ্যাকেট, ট্রেনিং কিট, স্কার্ফ, ব্যাকপ্যাক, স্মারক বল—সবকিছুর বিক্রি শুরু হয় মুহূর্তেই। একটি বিশ্বকাপ জয়ের ছবি আগামী চার বছর ব্যবহার করা যাবে টেলিভিশন, বিলবোর্ড, সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন এবং নতুন পণ্যের প্রচারে।
অ্যাডিডাসের আরেকটি বড় উপস্থিতি ছিল অফিসিয়াল ম্যাচ বলে। টুর্নামেন্টের জন্য তারা তৈরি করেছে 'ট্রিওন্ডা', আর সেমিফাইনাল ও ফাইনালের জন্য এনেছে বিশেষ 'ট্রিওন্ডা ফাইনাল'। এতে কানেক্টেড বল টেকনোলজি রয়েছে, যা বলের স্পর্শের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে রেফারি ও ভিএআর সিস্টেমে পাঠাতে সক্ষম। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি লঞ্চ করেছে নতুন প্রজন্মের 'F50 Hyperfast Evo' বুট, যাকে তারা সবচেয়ে হালকা প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল বুটগুলোর একটি হিসেবে প্রচার করছে। এছাড়া নতুন রঙে এসেছে 'Predator' সিরিজও।
তবে নাইকি একেবারে পিছিয়ে নেই। বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ব্যক্তিগত ক্রীড়া স্পন্সরশিপগুলোর বড় অংশ এখনও তাদের হাতে। কিলিয়ান এমবাপ্পে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, আর্লিং হলান্ড, গাভি, কোবি মাইনু, জামাল মুসিয়ালা—নতুন প্রজন্মের বহু তারকা নাইকির সঙ্গে যুক্ত। পিউমাও তাদের মতো করে এগোচ্ছে। নেইমার এখনও তাদের সবচেয়ে বড় মুখ, আর আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার তরুণ প্রতিভাদের নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করছে তারা।
ফিফার সঙ্গে অ্যাডিডাসের সম্পর্ক নিয়ে নানা গুঞ্জন থাকলেও বাস্তবে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ১৯৭০ সাল থেকে বিশ্বকাপের অফিসিয়াল ম্যাচ বল তৈরি করছে অ্যাডিডাস। ফিফার সবচেয়ে পুরোনো বাণিজ্যিক অংশীদারদের অন্যতম তারা। ভবিষ্যতে নতুন দরপত্র হতে পারে, কিন্তু নাইকি দায়িত্ব নিচ্ছে—এমন কোনো নিশ্চিত ঘোষণা নেই।
লিওনেল মেসি ফাইনালের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নিতে পারেন, কিন্তু অ্যাডিডাসের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি ব্যক্তিগত চুক্তি রয়েছে। ইন্টার মিয়ামির সঙ্গেও তাঁর চুক্তি আছে। ফলে ক্লাব ফুটবল, লাইফস্টাইল কালেকশন, সিগনেচার বুট, প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম—সবখানেই মেসি থাকবেন অ্যাডিডাসের অন্যতম প্রধান মুখ। শিশুদের জন্য Adidas Kids ক্যাম্পেইনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর।
ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে অ্যাডিডাস ইতোমধ্যে বিনিয়োগ করেছে লামিনে ইয়ামাল, জুড বেলিংহ্যাম, ফ্লোরিয়ান ভিরৎস, পেদ্রি, আলেহান্দ্রো গারনাচোদের ওপর। নাইকির ভরসা এমবাপ্পে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, হলান্ড, মুসিয়ালা, কোবি মাইনু, গাভিরা। পিউমা চেষ্টা করছে পরবর্তী সুপারস্টারদের শুরুতেই নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করতে।
বিশ্বকাপের প্রতিটি গোলের পেছনে থাকে গবেষণা, প্রতিটি জার্সির পেছনে থাকে ডিজাইন টিম, প্রতিটি বুটের পেছনে থাকে বছরের পর বছর প্রযুক্তিগত উন্নয়ন। আর প্রতিটি বিশ্বচ্যাম্পিয়নের ছবির পেছনে থাকে বিপণনের এক বিশাল পরিকল্পনা। এক সময় বিশ্বকাপের নায়ক ছিলেন শুধু খেলোয়াড়েরা; এখন নায়ক ব্র্যান্ডও। একটি গোল যেমন ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেয়, তেমনি একটি বিশ্বকাপ বদলে দিতে পারে একটি ক্রীড়া ব্র্যান্ডের বিক্রি, বাজারমূল্য ও বৈশ্বিক প্রভাবের হিসাব।




