কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার শিক্ষাক্ষেত্রে এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চমাধ্যমিক স্তরের ৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের স্কুলের কাজে জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করেছে, কিন্তু মাত্র ৩০ শতাংশ বিদ্যালয়ে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। এই পরিস্থিতি শিক্ষাবিদদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে—শিক্ষার্থীরা আসলে নিজেরাই শিখছে নাকি শুধু এআই-এর তৈরি উত্তর জমা দিচ্ছে, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে।
উইসকনসিন-স্টাউট পলিটেকনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল সাইকোলজির সহকারী অধ্যাপক ব্রেট ডিজেগার ২০২৫ সালের বসন্ত থেকে ২০২৬ সালের বসন্ত পর্যন্ত এক জরিপ পরিচালনা করেন। এতে উইসকনসিনের ৩০৩ জন শিক্ষক, প্রশাসক, আইটি কর্মী ও প্রযুক্তি পরিচালক এবং অন্যান্য শিক্ষা পেশাজীবী অংশ নেন। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আরও ১৩২ জন পেশাজীবীর মতামত নেওয়া হয়। ফলাফল জাতীয় প্রতিনিধিত্বমূলক না হলেও, এটি বর্তমান পরিস্থিতির একটি চিত্র তুলে ধরে।
জরিপে অংশ নেওয়া শিক্ষক ও প্রশাসকদের মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল একাডেমিক অসততা ও চুরি। উইসকনসিনে প্রায় ৬৫ শতাংশ এবং জাতীয় পর্যায়ে ৭৪ শতাংশ উত্তরদাতা এই বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছেন। এছাড়া, এআই ব্যবহারের কারণে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখন মূল্যায়নে অসুবিধার কথাও জানিয়েছেন অনেকে। উইসকনসিনের ৪৭ শতাংশ এবং জাতীয় নমুনার ৫৩ শতাংশ উত্তরদাতা এই সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন।
শিক্ষার্থীদের আচরণ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এআই-এর প্রভাব প্রসঙ্গে উইসকনসিনের ২৯ শতাংশ এবং জাতীয় নমুনার ৪০ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, শিক্ষার্থীরা এআই-এর ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, ১৯ শতাংশ (উইসকনসিন) ও ৩৩ শতাংশ (জাতীয়) উত্তরদাতা মনে করেন, এআই সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা হ্রাস করছে।
শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরেই জানেন যে একটি অ্যাসাইনমেন্ট সম্পন্ন করার মানেই প্রকৃত শেখা নয়। বাবা-মায়ের অতিরিক্ত সাহায্য, বন্ধুর কাছ থেকে নকল করা—এসব সমস্যা আগেও ছিল। কিন্তু জেনারেটিভ এআই এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। এখন একজন শিক্ষার্থী সহজেই একটি প্রম্পট কপি-পেস্ট করে এআই-এর তৈরি একটি প্যারাগ্রাফ বা রচনা জমা দিতে পারে, যা দেখতে সুসংহত ও নির্ভুল মনে হয়। ফলে শিক্ষকের পক্ষে বোঝা কঠিন হয়ে যায় যে শিক্ষার্থী আসলে বিষয়বস্তু বুঝেছে কিনা।
কিছু শিক্ষক এআই-শনাক্তকারী টুল ব্যবহার করেন। ২০২৫ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ৪৩ শতাংশ শিক্ষক নিয়মিত এসব টুল ব্যবহার করেন, আর ২৭ শতাংশ অন্তত পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করেছেন। তবে এসব টুলের নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু টুলের মিথ্যা-ইতিবাচক হার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত এবং মিথ্যা-নেতিবাচক হার ১০০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, এআই-লেখা টেক্সটের ২০ শতাংশ ভুলভাবে মানব-লেখা বলে চিহ্নিত হয়, এবং যদি সেটি হাতে সম্পাদিত হয় তবে এই হার ৫২ শতাংশে পৌঁছে। বিশেষ করে নন-নেটিভ ইংরেজি লেখা এআই-লেখা হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা ৬১.৩ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্কুলগুলোর উচিত অ্যাসাইনমেন্ট ডিজাইন পুনর্বিবেচনা করা। সব অ্যাসাইনমেন্ট এক রকম নয়—কোনোটিতে এআই ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হতে পারে, যেখানে শিক্ষকের শিক্ষার্থীর স্বাধীন চিন্তা দেখার প্রয়োজন। আবার কোনো অ্যাসাইনমেন্টে এআই-কে ব্রেনস্টর্মিংয়ের জন্য অনুমতি দিয়ে শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীর নিজের নোট ও প্রতিফলন জমা দেওয়ার শর্ত দেওয়া যেতে পারে। এমনকি শিক্ষার্থীদের এআই-উত্পন্ন উত্তর সমালোচনা করতে বলা যেতে পারে।
শিক্ষকরা নিজেরাও এআই ব্যবহার করছেন—পাঠ পরিকল্পনা, যোগাযোগ, ডকুমেন্টেশন ও প্রশাসনিক কাজে। কিন্তু তাদের উদ্বেগ নির্দিষ্ট—একাডেমিক অসততা, মূল্যায়ন, শিক্ষার্থীর নির্ভরশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, ভুল তথ্য ও গোপনীয়তা। লক্ষ্য যতটা সম্ভব এআই-এর অপব্যবহার ধরা নয়, বরং এমন শেখার কাজ ডিজাইন করা যেখানে শিক্ষক এখনও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পেতে পারেন: এই শিক্ষার্থী আসলে কী বুঝেছে?


