জার্মানির টুবিঙ্গেন শহরে কাটানো একটি দিন নিয়ে লিখেছেন এক প্রবাসী। স্টুটগার্টে আসার দশ দিনের মাথায় ২৫ সেপ্টেম্বর সকালে ৮৭ দিনের নাতনি রূপকথার টিকার নির্ধারিত ডোজ দেওয়ার কথা ছিল। সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শহরটির নানা দিক দেখার সুযোগ হয় তাদের।
সকালে অনিত নিজেই গাড়ি চালিয়ে বোবলিঙ্গেনের হেলেনবাড থেকে তাদের নিয়ে যান টুবিঙ্গেনের ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের শিশু ও কিশোর চিকিৎসা বিভাগে। জার্মানির অন্যতম সেরা এই শিশু হাসপাতালটি অত্যাধুনিক চিকিৎসা ও বিশেষায়িত শিশু স্বাস্থ্যসেবার জন্য পরিচিত। পথে পরিচ্ছন্ন সড়ক, সারি সারি সবুজ গাছ আর নিখুঁত আবাসিক এলাকা দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোনো শিল্পীর আঁকা ছবির ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন তারা। মেডিসিন সেন্টারে পৌঁছে চিকিৎসক রূপকথাকে পরীক্ষা করেন এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই টিকা দেওয়া হয়। সুচের স্পর্শে ছোট্ট মুখটি কান্নায় ভেঙে পড়লেও মায়ের স্নেহ ও নানির আদরে তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। জার্মান স্বাস্থ্যব্যবস্থার শৃঙ্খলা ও রোগীদের প্রতি আন্তরিক আচরণ তাদের মুগ্ধ করে।
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আনিকা তাদের এবারহার্ড কার্লস বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিয়ে যান। ১৪৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ইউরোপের জ্ঞানচর্চার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। প্রাচীন ভবন, পাথরে বাঁধানো প্রাঙ্গণ আর শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি ইতিহাস ও আধুনিকতার এক অপূর্ব সেতুবন্ধ রচনা করেছে। কেউ বই হাতে, কেউ গবেষণাগারে, কেউ খোলা প্রাঙ্গণে আলোচনায় মগ্ন — জ্ঞানচর্চার এমন বাস্তব প্রতিচ্ছবি তাদের চোখে ভেসে উঠল।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছেড়ে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মধ্যে স্ট্রলারে রূপকথাকে ঢেকে তারা শহরের কেন্দ্রস্থলে পৌঁছান। নেকার নদীর তীরে একটি মনোরম রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খান তারা। দোতলার খোলা বারান্দা থেকে নদীর স্বচ্ছ জলরাশি আর ছোট ছোট হাঁস ভেসে যেতে দেখা যাচ্ছিল। নদীর দুই ধারে সবুজ প্রান্তরে শিশুরা খেলছিল, কেউ হাঁটছিল, কেউ সাইকেল চালাচ্ছিল। সেপ্টেম্বরের শেষে শরৎ প্রকৃতিকে নতুন রঙে সাজাতে শুরু করেছে — গাছের পাতায় হলুদ, কমলা ও লালচে রঙের মিশেল শহরটিকে এক অনন্য সৌন্দর্যে ভরিয়ে তুলেছিল।
এরপর তারা টুবিঙ্গেনের ওল্ড সিটিতে প্রবেশ করেন। জার্মানির অন্যতম সুন্দর ও সংরক্ষিত মধ্যযুগীয় নগরকেন্দ্র এটি। ছোট ছোট সরু গলি, রঙিন অর্ধ কাঠের বাড়ি, লাল টালির ছাদ, প্রাচীন গির্জা আর ঐতিহাসিক চত্বর — সব মিলিয়ে যেন ইতিহাসের এক জীবন্ত জাদুঘর। কেন্দ্রস্থল মার্কটপ্লাৎসে দাঁড়িয়ে থাকা ১৫ শতকের টাউন হল তার অলংকৃত ঘড়ি ও রঙিন সম্মুখভাগের জন্য বিশেষ আকর্ষণীয়। নেকার নদীর তীরে অবস্থিত বিখ্যাত হোল্ডারলিন টাওয়ারে জার্মান কবি ফ্রিডরিখ হোল্ডারলিন জীবনের শেষ ৩৬ বছর কাটিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে তুলনামূলকভাবে রক্ষা পাওয়ায় শত শত বছরের স্থাপত্য আজও অক্ষত। পাথর বসানো সরু রাস্তা, কাঠ ও পাথরের তৈরি শতবর্ষী বাড়ি আর পুরোনো গির্জার সুউচ্চ চূড়া দেখে মনে হচ্ছিল সময় যেন এখানে থমকে দাঁড়িয়ে আছে।
দিন গড়িয়ে বিকেল হলে শহর ঘুরে দেখার স্মৃতি বুকে নিয়ে তারা রেলস্টেশনের উদ্দেশে রওনা দেন। কিন্তু স্টেশনে পৌঁছে জানতে পারেন কারিগরি ত্রুটির কারণে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ। পরিকল্পনা এলোমেলো হয়ে গেলেও আনিকার মধ্যে দুশ্চিন্তার লেশমাত্র ছিল না। রেলস্টেশনে আরও কয়েকজন যাত্রী একই সমস্যায় পড়েছিলেন। প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর বিকল্প বাস পরিষেবার ব্যবস্থা করা হলো। আশ্চর্যের বিষয়, এত মানুষের ভিড়েও কোথাও কোনো হইচই বা বিশৃঙ্খলা ছিল না — সবাই শান্তভাবে অপেক্ষা করছিলেন। বাসে উঠে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন তারা। সন্ধ্যার অন্ধকারে শহরের আলোগুলো জ্বলে উঠে টুবিঙ্গেনকে আরও স্বপ্নময় করে তুলেছিল।
অবশেষে নিরাপদে বোবলিঙ্গেন ও স্টুটগার্টে ফিরে আসেন তারা। ট্রামে হেলেনবাড পৌঁছালে সেখানে অনিত গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। দিনটি শুরু হয়েছিল নাতনির টিকাদান দিয়ে, আর শেষ হলো এক অপ্রত্যাশিত ভ্রমণ–অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। হাসপাতালের সুশৃঙ্খল পরিবেশ, নদীর ধারে মধ্যাহ্নভোজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণচাঞ্চল্য, ইতিহাসঘেরা পুরোনো শহরের নীরব সৌন্দর্য আর রেলস্টেশনে অনিশ্চয়তার এক ঘণ্টা — সব মিলিয়ে টুবিঙ্গেনে কাটানো সেই দিন তাদের ভ্রমণের এক অনন্য অধ্যায় হয়ে রইল। লেখকের মতে, একটি শহরকে সত্যিকার অর্থে চিনতে হলে শুধু দর্শনীয় স্থান নয়, দৈনন্দিন জীবন, মানুষ, শৃঙ্খলা ও অপ্রত্যাশিত মুহূর্তগুলোকে অনুভব করতে হয়।




