দীর্ঘদিন ধরে চলা তীব্র জ্বালানি সংকটের পর অবশেষে কিছুটা স্বস্তির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। শনিবার ভোর থেকে দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি-র সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে, কারণ কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত সামিট ও এক্সিলারেট এনার্জি—এই দুই টার্মিনালই এখন কার্যকর। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান নিশ্চিত করেছেন যে, সামিটের টার্মিনালটি তার পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করছে এবং এক্সিলারেটের টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হয়েছে। এর ফলে সাধারণ গ্রাহক ও শিল্পকারখানাগুলো কিছুটা স্বস্তি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জ্বালানি বিভাগের অধীনে পেট্রোবাংলা এবং তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) এলএনজি আমদানির তদারকি করে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যানুযায়ী, শনিবার ভোর ৪টার দিকে সামিটের টার্মিনাল থেকে ৪৬ কোটি ঘনফুট এবং এক্সিলারেট থেকে ৩০ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ শুরু হয়। উল্লেখ্য, সামিটের টার্মিনালের মোট সক্ষমতা ৫০ কোটি ঘনফুট এবং এক্সিলারেটের সক্ষমতা ৬০ কোটি ঘনফুট।
গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট টার্মিনালে একটি অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছিল, যার ফলে দুটি বয়লারের মধ্যে একটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ঘটনার পর থেকে দেশে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দেয়, যার প্রভাব পড়ে রান্নার চুলা, শিল্পকারখানা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে। লোডশেডিং বৃদ্ধি পায় এবং সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা দেয়। ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি মেরামতের কাজ এখনও চলছে এবং এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে হলে টার্মিনালের সরবরাহ ৭২ ঘণ্টা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হবে, যার সময়সীমা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে অক্ষত বয়লারটি থেকে গত ৬ আগস্ট সরবরাহ শুরু হলেও কারিগরি ত্রুটির কারণে শুক্রবার বিকেলে তা সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল, যা পরে পুনরায় চালু করা হয়।
অন্যদিকে, সামিটের টার্মিনাল থেকেও এলএনজি স্বল্পতার কারণে গত সোমবার থেকে সরবরাহ কমানো হয়েছিল। বুধবার ও বৃহস্পতিবার তা মাত্র ১০ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে এবং বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। তবে শুক্রবার বিকেলে বঙ্গোপসাগরে 'ভিটল' কোম্পানির একটি জাহাজ পৌঁছালে এলএনজি খালাস শুরু হয়। আগে মজুত থেকে সরবরাহ শুরু করলেও রাত থেকে তা বেড়ে ৪৬ কোটি ঘনফুটে পৌঁছায় এবং আরও ৭-৮ কোটি ঘনফুট বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে সৌদি আরামকোর একটি জাহাজ কারিগরি অসামঞ্জস্যতা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ফেরত পাঠানো হয়েছিল, যার পরিবর্তে তারা নতুন জাহাজ পাঠাবে বলে জানিয়েছে।
দেশের দৈনিক গ্যাসের মোট চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট, যদিও ৩০০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ থাকলে পরিস্থিতি মোটামুটি স্থিতিশীল থাকে। স্বাভাবিক সময়ে রেশনিংয়ের মাধ্যমে ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হয়, যার মধ্যে ১০৫ কোটি ঘনফুট আসে এলএনজি থেকে। শুক্রবার বিকেলে দেশের মোট সরবরাহ ১৭৩ কোটি ঘনফুটে নেমে গিয়েছিল, যা বর্তমানে বেড়ে প্রায় ২৪০ কোটি ঘনফুট হয়েছে। অর্থাৎ, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এখনো দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুটের ঘাটতি বিদ্যমান। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এক্সিলারেট টার্মিনালটি পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরলে এই ঘাটতি পূরণ হবে। তবে তাৎক্ষণিক কোনো স্থায়ী সমাধান না থাকায় বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক বৃষ্টি ও ছুটির কারণে বিদ্যুতের চাহিদা কমায় লোডশেডিং কিছুটা কমেছে, তবে তাপমাত্রা বাড়লে আবারও সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।




