নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার চিলাহাটি স্থলবন্দরের দৃশ্য এখন করুণ। দূর থেকে দৃষ্টিনন্দন মনে হলেও কাছে গেলে দেখা যায় এক নিঝুম ও পরিত্যক্ত পরিবেশ। একতলার বারান্দায় সারি সারি ফ্যান স্থির হয়ে আছে, আর জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে ধুলায় বিবর্ণ হয়ে থাকা প্যাকেটবন্দী চেয়ার-টেবিল ও স্টিলের টুলের সারি। ভবনের দ্বিতীয় তলায় ব্যাংক ও শুল্ক কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত কক্ষগুলো সম্পূর্ণ খালি, এমনকি তৃতীয় তলায় রেস্তোরাঁর জন্য রাখা জায়গাটুকুও এখন জনশূন্য। শুধু মূল ভবনই নয়, সংলগ্ন দোতলা ভিআইপি অতিথিশালা, ওভারব্রিজ, যাত্রীছাউনি এবং গার্ডরুম সবকিছুই এখন তালাবদ্ধ। এমনকি সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত রেললাইনগুলোতে ধরেছে মরিচা।

পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এই অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছিল প্রায় ১৩০ কোটি টাকা। তবে রেলের ওয়াগন, বিদ্যুৎ এবং রাস্তার আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকায়। প্রকল্পের পরিচালক মো. আবদুর রহিম জানান, ২০২৪ সালের জুন মাসে ১২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে মূল প্রকল্পটির কাজ শেষ হয়। এই প্রকল্পের আওতায় প্ল্যাটফর্ম বাড়ানো, ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ এবং কোচ মেরামতের শেডসহ আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা হয়েছিল। উত্তরবঙ্গের মানুষের সুবিধার্থে এখানে ইমিগ্রেশন সেবার প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা কাজে লাগানোর আগেই পুরো ব্যবস্থাটি অচল হয়ে পড়ে।

ব্রিটিশ আমলের চিলাহাটি-হলদিবাড়ী রেলপথটি ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘ সময় পর ২০১৩ সালে একে স্থলবন্দর ঘোষণা করা হয় এবং ২০১৯ সালে ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ২০২১ সালের ১ আগস্ট পণ্য পরিবহন এবং ২০২২ সালে যাত্রীবাহী ‘মিতালি এক্সপ্রেস’ চালু হয়। তবে ২০২৪ সালের মে মাসে ভারতে পাথরের দাম বেড়ে যাওয়ায় পণ্য আমদানি কমে আসে এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যাত্রীবাহী ট্রেনের চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়। অবশেষে ২০২৫ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার অবকাঠামোর অভাবের কথা উল্লেখ করে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই স্থলবন্দরটি বন্ধ ঘোষণা করে।

এই অচলাবস্থার প্রভাব পড়েছে রেলওয়ের আয়েও। স্টেশন মাস্টার রুহুল আমিনের তথ্যমতে, পণ্য পরিবহন চালু থাকাকালীন প্রতি চালানে ২০ থেকে ২৬ লাখ টাকা ভাড়া পাওয়া যেত, যা মাসে গড়ে এক থেকে দেড় কোটি টাকায় পৌঁছাত। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে যেখানে স্টেশনের আয় ছিল ৮০ লাখ টাকা, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তা নেমে এসেছে মাত্র ৩৫ লাখ টাকায়। বর্তমানে এখানে ৫০ জনের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকলেও তাঁদের কাজের চাপ এখন নামমাত্র, কারণ কেবল অভ্যন্তরীণ ট্রেন চলাচল করছে।

স্থলবন্দরটি বন্ধ হওয়ায় চরম হতাশায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। নীলফামারী চেম্বারের সাবেক সভাপতি মো. আবদুল ওয়াহেদ জানান, এই বন্দরের মাধ্যমে কম খরচে সৈয়দপুর পর্যন্ত পাথর আনা যেত, যা এখন পঞ্চগড় হয়ে ট্রাকে আনতে গিয়ে খরচ অনেক বেড়ে গেছে। স্থানীয় শ্রমিক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা কাজ হারিয়েছেন, এমনকি বন্দরকেন্দ্রিক বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা ব্যবসায়ীরাও বিপাকে পড়েছেন। তবে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান স্পষ্ট করেছেন যে, বর্তমানে এটি চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এটি পুনরায় সচল করতে হলে বাংলাদেশ ও ভারত—উভয় দেশের সম্মতি এবং উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।