বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে মাত্র ৯টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক সক্রিয় থাকলেও দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। দেশের মোট রপ্তানি কার্যক্রমের প্রায় ১৯ শতাংশ এবং আমদানির ১৩ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হয় এই বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে ২০২৫ সালের শেষ ছয় মাসে এসব ব্যাংক ৪১২ কোটি ডলারের রপ্তানি বিল সংগ্রহ করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। অন্যদিকে, আমদানি বিল পরিশোধের ক্ষেত্রেও এগিয়েছে তারা — ২০২৫ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ৪২৯ কোটি ডলারের আমদানি বিল নিষ্পত্তি করেছে এই ব্যাংকগুলো, যা দেশের মোট আমদানির ১৩.১ শতাংশ। তবে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স সংগ্রহে তাদের অবদান নেহাতই নগণ্য, মাত্র ০.৩ শতাংশ।

দেশে কার্যরত বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করছে এইচএসবিসি ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ। বাকি ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে সিটি ব্যাংক এনএ, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, উরি ব্যাংক, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, হাবিব ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং ব্যাংক আলফালাহ। এই ৯টি ব্যাংকের অধীনে দেশে মোট ৭০টি শাখা এবং ৫টি উপশাখা রয়েছে। শাখা নেটওয়ার্ক ও ভোক্তা পর্যায়ের তেমন কার্যক্রম না থাকা সত্ত্বেও আমানত সংগ্রহে এসব ব্যাংক বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে, যদিও সাম্প্রতিক সময়ে তাদের আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে নগণ্য।

২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট আমানত ছিল ৮৭ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সামান্য বেড়ে ৮৭ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। কিন্তু পুরো ব্যাংকিং খাতের তুলনায় তাদের আমানতের বাজার অংশ কমেছে — ৪.৬ শতাংশ থেকে নেমে ৪.২ শতাংশে। আমানতের কাঠামোয় বিদেশি ও দেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। দেশীয় ব্যাংকগুলোর আমানতের বড় অংশ (৪৮ শতাংশ) উচ্চ সুদের স্থায়ী আমানত, অথচ বিদেশি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ১৬ শতাংশ। বিপরীতে, বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের ৩৯ শতাংশ আসে চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে, যা তুলনামূলকভাবে কম সুদের খাত; দেশি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এই হার ২৯ শতাংশ। এছাড়া ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিদেশি ব্যাংকগুলোর রেসিডেন্ট ফরেন কারেন্সি ডিপোজিট (আরএফসিডি) ছিল মোট আমানতের ১৭ শতাংশ, যেখানে দেশি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে তা মাত্র ২ শতাংশ। করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকদের ওপর বেশি নির্ভরতার কারণে বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহের খরচ তুলনামূলকভাবে কম থাকে।

ঋণ বিতরণে অবশ্য গত বছর সংকোচন দেখা গেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ ছিল ৫১ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১১.৩ শতাংশ কমে ৪৬ হাজার ১২২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফলে পুরো ব্যাংকিং খাতে তাদের ঋণের অংশ ৩.১ শতাংশ থেকে কমে ২.৬ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে মুনাফার দিক থেকে তারা পিছিয়ে নেই। ২০২৪ সালের শেষ ছয় মাসে বিদেশি ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফা ছিল ৩ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে বেড়ে ৩ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মুনাফা ও আয় বিদেশে পাঠানোর পরিমাণ গত বছর ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে — ২০২৪ সালের শেষ ছয় মাসে এই অঙ্ক ছিল ৫৭৭ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩১৪ কোটি টাকায়। ডলার সংকটের কারণে আগে তুলনামূলক কম মুনাফা ও আয় বিদেশে পাঠাতে পেরেছিল বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

দেশের অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব অবশ্য বিদেশি ব্যাংকগুলোর মুনাফাতেও পড়েছে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ ২০২৫ সালে ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে, যা আগের বছর ছিল ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এইচএসবিসির মুনাফা ২৩ শতাংশ কমে ২০২৫ সালে ৮২৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে; ২০২৪ সালে তা ছিল ১ হাজার ৮৬ কোটি টাকা। একইভাবে কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের মুনাফা ৬০০ কোটি টাকা থেকে কমে ৫৭৬ কোটি টাকা হয়েছে। সিটি ব্যাংক এনএ বাংলাদেশের কার্যক্রমের মুনাফা ৩৮৪ কোটি টাকা থেকে কমে ৩২৮ কোটি টাকায় নেমেছে। স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার মুনাফাও ২৩০ কোটি টাকা থেকে কমে ২০৭ কোটি টাকা হয়েছে। হাবিব ব্যাংক ২০২৫ সালে মুনাফা করেছে মাত্র ১৮ কোটি টাকা, যা আগের বছর ছিল ২৪ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, বিশ্বাস ও সেবার মানের কারণে কম সুদ পেলেও মানুষ বিদেশি ব্যাংকে আস্থা রাখছে। বৈশ্বিক সেবা দ্রুত গ্রহণ করায় ভালো করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এসব ব্যাংকের গ্রাহক হচ্ছে। ধনী ও উচ্চ শ্রেণির মানুষেরাও এই ব্যাংকগুলোর উপর আস্থা রাখে। ফলে কম খরচে এসব ব্যাংক উচ্চ মুনাফা করতে পারছে। পাশাপাশি দেশি ব্যাংকগুলোর এসএমই ও ক্ষুদ্র খাতেও অর্থায়ন করে যাচ্ছে তারা। তার মতে, বিদেশি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশে ভালো করছে এবং দেশি ব্যাংকগুলো তাদের কাছ থেকে অনেক সেবা ও ব্যাংকিং সংস্কৃতি গ্রহণ করছে।