পরমাণু সংযোজন বা নিউক্লিয়ার ফিউশনের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ পরিচ্ছন্ন জ্বুরি উৎপাদনের পথে বড় ধরনের অগ্রগতি সাধন করেছে চীন। সম্প্রতি দেশটি একটি ৫৮২ টন ওজনের অতিপরিবাহী ফিউশন চুম্বকের সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে, যা একটি ‘কৃত্রত সূর্য’ বিনির্মাণের অভিলক্ষ্যের দিকে তাদের আরও একধাপ এগিয়ে দিয়েছে। চায়নিজ একাডেমি অব সায়েন্সেসের অধীনস্থ ইনস্টিটিউট অব প্লাজমা ফিজিকস এই চুম্বকটি তৈরি করেছে।
চৌম্বকীয় কনফাইনমেন্ট ফিউশন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রনের জন্য নকশা করা এই যন্ত্রটি ইংরেজি ‘ডি’ আকারের একটি সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বক। ২১ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১২ মিটার প্রস্থবিশিষ্ট এই কাঠামো এখন পর্যন্ত নির্মিত সর্ববৃহৎ ফিউশন চুল্লি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। সবচেয়ে বড় কথা, এটি প্রস্তুতে সম্পূর্ণ দেশীয় কাঁচামাল ও নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লেগেছে বেইজিংয়ের দাবি মতে। বিদেশি প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের উপর নির্ভরতা কমিয়ে আনার পথে এটিকে এক বিশাল মাইলফলক ধরা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক থার্মোনিউক্লিয়ার এক্সপেরিমেন্টাল রিঅ্যাক্টরের (আইটিইআর) তৈরি সমমানের চুম্বকগুলোর তুলনায় চীনের এ চুম্বকটি আয়তনে ১ দশমিক ৩ গুণ বড় এবং শক্তি ধারণ করার সক্ষমতা প্রায় তিন গুণ বেশি। এর প্রাথমিক কাজ হলো একটি তীব্র চৌম্বকক্ষেত্র গঠন করে ১০ কটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা পর্যন্ত উত্তপ্ত প্লাজমাকে নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ রাখা। প্রসঙ্গত, সূর্যের কেন্দ্রভাগের তাপমাত্রা আনুমানিক ১ কোটি ৫০ লাখ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ চীনের এই ‘কৃত্রত সূর্য’র তাপমাত্রা হবে আমাদের সূর্যের কেন্দ্রীয় তাপমাত্রার প্রায় ৭ গুণ।
একটি পারমাণবিক ফিউশন যন্ত্র সফলভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গেলে যে শর্তগুলো পূরণ করাতে হয়, তার মধ্যে রয়েছে তাপমাত্রা ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে তোলা, দীর্ঘসময় ধরে স্থিতিশীল পরিচালন নিশ্চিত করা, এবং পুরো প্রক্রিয়াটির উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখা। বিশ্বজুরে বিজ্ঞানীরা সাত দশকের বেশি সময় ধরে এই কৃতিত্ব অর্জনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ইনস্টিটিউট অব প্লাজমা ফিজিকসের পরিচালক সং ইউনতাও এ প্রসংগে জানিয়েছেন, ভবিষ্যতের ফিউশন বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নিরবচ্ছিন্ন জোগান বজায় রাখতে প্লাজমার একটি স্বনির্ভর চক্র তৈরি করাটা অপরিহার্য। আর এ চক্র সচল রাখতে একটি ফিউশন যন্ত্রকে অবশ্যই সহস্র সেকেন্ড জুড়ে উচ্চ দক্ষতার সঙ্গে স্থিতিশীল থাকতে হবে। বেইজিং ২০৩০ সালের মধ্যেই ফিউশন শক্তি থেকে বাণিজ্যিক পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য স্থির করেছে।
এই চুমি পরীক্ষার ভিডিও প্রকাশিত হওয়ার পর অনলাইনে বিস্তর আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বহু সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী চীনের দূরদর্শী প্রযুক্তি পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির ভূয়সী প্রশংসা করছেন। পাশাপাশি, কেউ কেউ পশ্চিমা দেশ বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রান্ত অগ্রাধিকারের সমালোচনায় মুখর হয়েছেন। এক মন্তব্যকারী লিখেন, ‘চীন বিশ্বের জ্বালানি রাজধানীতে পরিণত হতে যাচ্ছে। তাই কৃত্রত বুদ্ধিমত্তার দৌড়েও তারা ইতিমধ্যেই বিজয়ী।’ আরেকজনের মতে, ‘যুক্তরাষ্ট্র এখনও অন্ধকার যুগে স্থির।’ উল্লেখ্য, পূর্ব চীনের আনহুই প্রদেশের হেফেই শহরে অবস্থিত এক্সপেরিমেন্টাল অ্যাডভান্সড সুপারকন্ডাক্টিং টোকামাক (ইস্ট) নামক প্রকল্পটি ২০০৬ সালে কাজ শুরু করার পর থেকে এটি দেশি-বিদেশি বিজ্ঞানীদের এক উন্মুক্ত গবেষণা প্লাটফর্ম হিসাবে ভূমিকা রেখে চলেছে।




