রোববার বেলা একটার দিকে সুন্দরবনের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের নিকটবর্তী বনে একটি বাঘিনীকে অবমুক্ত করার মধ্য দিয়ে দেশের বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচিত হলো। চলতি বছরের শুরুতে চোরা শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকে পড়া এই আহত বাঘিনীকে উদ্ধার, সুস্থ করে পুনরায় তার নিজস্ব আবাসস্থলে ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশে এই প্রথম।

ঘটনার সূত্রপাত গত ৩ জানুয়ারি। সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্যমারী টহল ফাঁড়ির আওতাধীন শরকির খালসংলগ্ন এলাকায় একটি বাঘিনী ফাঁদে পা আটকে গুরুতর আহত অবস্থায় পড়ে থাকার সংবাদ পায় বন বিভাগ। পরদিন ট্রাঙ্কুইলাইজার গান ব্যবহার করে তাকে অচেতন করা হয় এবং ফাঁদ কেটে লোহার খাঁচায় করে খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়। উদ্ধারের সময় দেখা যায়, বাঘিনীটির সামনের বাম পায়ে প্রায় তিন ইঞ্চি জায়গাজুড়ে চামড়া, মাংসপেশি ও শিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ফাঁদের রশিতে ক্রমাগত টানাটানির ফলে ক্ষতস্থানে পচন ধরেছে। প্রাণীটি তখন কঙ্কালসার অবস্থায় ছিল।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, বাঘিনীর বাম পায়ের জটিল ক্ষত তাদের গভীর উদ্বেগে ফেলেছিল। অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের পর ঘা শুকাতে শুরু করলেও বাঘিনীটি নিজেই খুঁচিয়ে সেখানে পুনরায় রক্তপাত ঘটাত। এটি ছিল চিকিৎসার পথে বড় বাধা। খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল জানান, এক বিশেষজ্ঞের পরামর্শে মধু প্রয়োগ করে ব্যান্ডেজ করার পর মার্চ মাস নাগাদ ক্ষত শুকাতে শুরু করে এবং সেখানে নতুন মাংসপেশি গজায়।

চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুরুতে বাঘিনীটিকে কলিজা খাওয়ানো হতো। স্বাস্থ্যের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তাকে জীবন্ত প্রাণী, যেমন শূকর শিকার করতে দেওয়া হয়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শিকার সাবাড় করার ক্ষিপ্রতা ফিরে পাওয়ার পর বিশেষজ্ঞরা তাকে প্রকৃতিতে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন।

শনিবার দিবাগত রাত তিনটায় পুনর্বাসন কেন্দ্রে বাঘিনীটিকে পুনরায় অচেতন করে বিশেষভাবে তৈরি একটি খাঁচায় স্থানান্তর করা হয় এবং চেতনা ফিরিয়ে আনা হয়। ভোর পাঁচটায় খুলনা থেকে সড়কপথে মোংলা ফুয়েল জেটিতে নিয়ে তাকে লঞ্চে তোলা হয়। রোববার দুপুর ১২টার দিকে লঞ্চটি শ্যালা নদী পথে আন্ধারমানিক এলাকায় পৌঁছায়।

খাঁচার দরজা খুলে দেওয়ার পরও বাঘিনীটি সহজে বেরোচ্ছিল না। গুটিসুটি মেরে বসে থাকা প্রাণীটি প্রথমে খাঁচার ভেতরেই শরীর এলিয়ে দেয়। বন বিভাগের কর্মীদের নানামুখী প্রচেষ্টার পর অবশেষে বেলা একটার দিকে সে ছোট্ট একটি লাফ দিয়ে খাঁচা থেকে নেমে বনের গভীরে মিলিয়ে যায়। উপস্থিত সবার মাঝে স্বস্তি নেমে আসে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত প্রত্যক্ষ করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমির হোসাইন চৌধুরী এবং অন্যান্য বন কর্মকর্তা ও বন্য প্রাণী গবেষকরা।

অবমুক্তির তিন ঘণ্টা পর অধ্যাপক এম এ আজিজ ও বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিমের নেতৃত্বে একটি দল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বনে প্রবেশ করে। অধ্যাপক আজিজ জানান, তারা বাঘিনীর পায়ের ছাপ অনুসরণ করে প্রায় ১৫০ মিটার ভেতরে যান। ছাপ দেখে বোঝা গেছে, প্রাথমিক দ্বিধা কাটিয়ে বাঘিনীটি দ্রুত তার পুরোনো বিচরণ এলাকা চিনে নিচ্ছে এবং কয়েক দিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ খাপ খাইয়ে নেবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তবে বন্য প্রাণী উদ্ধার কার্যক্রমে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। খুলনা বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তা মো. মফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, আধুনিক যানবাহন ও সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। ব্যবহৃত খাঁচাটিও যথাযথ ছিল না। অবমুক্তি ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে না করে অটোমেটিক যানবাহনে করাই উত্তম। এই সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সাফল্যের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।