১৯ জুলাই বিশ্ব শ্রবণ দিবসের প্রাক্কালে কলকাতার অশ্বিনী দত্ত রোডের শরৎচন্দ্র বাসভবনে বিশেষ এক আলোচনা সভার আয়োজন করে শরৎ সমিতি। 'কলের গান থেকে রিলস—বাঙালির গান শোনার বিবর্তনের গল্প' শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের মূল প্রতিপাদ্য ছিল শোনার চর্চা বা 'লিসেনিং অ্যাজ আ প্র্যাকটিস'। সভার সঞ্চালনা ও ভাবনার দায়িত্বে ছিলেন বিশিষ্ট নজরুলসংগীতশিল্পী ও গবেষক সোমঋতা মল্লিক, যিনি একইসঙ্গে ছায়ানটের (কলকাতা) সভাপতি। তাঁর সূচনায় আলোচনাটি তথ্যসমৃদ্ধ ও আবেগঘন হয়ে ওঠে।

আলোচনায় অংশ নেন রামমোহন লাইব্রেরি অ্যান্ড ফ্রি রিডিংরুমের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জিত মিত্র, গ্রামোফোন রেকর্ড সংগ্রাহক ও বিখ্যাত সংগীতশিল্পী সত্য চৌধুরীর ভ্রাতুষ্পুত্র পরমানন্দ চৌধুরী, মনোবিশ্লেষক ও সংগীতশিল্পী ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিহান মিউজিকের অন্যতম কর্ণধার নীলাদ্রি দেব ভট্টাচার্য। প্রত্যেকে নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে বাঙালির গান শোনার ঐতিহ্য ও রূপান্তর নিয়ে কথা বলেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে সোমঋতা বাংলাদেশের গবেষক আবুল আহসান চৌধুরীর 'বাঙালির কলের গান' বই থেকে কিছু অংশ পাঠ করে শোনান। তিনি উল্লেখ করেন, গ্রামোফোন বা 'কলের গান' একসময় বাঙালির নিত্যসঙ্গী ছিল, যা ধীরে ধীরে স্মৃতি থেকে শুধু শ্রুতিতে পরিণত হয়েছে। সঞ্জিত মিত্র জানান, রামমোহন লাইব্রেরিতে প্রায় পাঁচ হাজার গ্রামোফোন রেকর্ডের সংগ্রহ রয়েছে। প্রতি মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার সেখানে 'কলের গান' শোনার আসর বসে, যেখানে প্রবীণ থেকে নবীন—সব বয়সের সঙ্গীতপ্রেমীরা অংশ নেন।

পরমানন্দ চৌধুরীর সংগ্রহ থেকে রবীন্দ্র-প্রয়াণে রচিত কাজী নজরুল ইসলামের 'ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে' গানটি শোনানো হয়। নজরুলের কণ্ঠের এই গান শুনে উপস্থিত শ্রোতারা আবেগাপ্লুত হন। এছাড়াও সোমঋতা ভারতবর্ষে রেকর্ডিংযাত্রার ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৯০২ সালে গ্রামোফোন কোম্পানি ফ্রেডরিক উইলিয়াম গেইসবার্গকে কলকাতায় পাঠায়। ৮ নভেম্বর প্রথম বাঙালি শিল্পী হিসেবে মিস শশীমুখী ‘কাঁহা জীবনধন’ কীর্তনটি রেকর্ড করেন। গেইসবার্গের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার ছিল গওহরজান, যিনি ১১ নভেম্বর হিন্দুস্তানি ভাষায় গান রেকর্ড করেন এবং পরে তাঁর প্রথম বাংলা গান ‘ভালোবাসিবে বলে ভালোবাসিনে’ রেকর্ড হয়। লালচাঁদ বড়ালসহ আরও অনেক শিল্পী তখন রেকর্ডিংয়ের সুযোগ পান।

নীলাদ্রি দেব ভট্টাচার্য বর্তমান সময়ের সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখার লড়াইয়ের কথা বলেন। ২০০৩ সালে বিহান মিউজিকের যাত্রা শুরু হলেও এখন সুস্থ সংস্কৃতির জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। তিনি আবুল আহসান চৌধুরীর সেই প্রশ্নের প্রতিধ্বনি করেন, যেখানে বলা হয়েছে—প্রযুক্তির কারণে যুগ পাল্টালেও হারিয়ে যাওয়া এই মহান অধ্যায়ের বেদনা কি কাউকে ভারাক্রান্ত করে না? ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায় শোনার অভ্যাস কমে যাওয়া প্রসঙ্গে আলোচনা করেন এবং শোনার প্রয়োজনীয়তা ও ধৈর্যচ্যুতি না ঘটিয়ে শোনার মাধ্যমে প্রিয়জনদের ভরসাস্থল হওয়ার পরামর্শ দেন। সবশেষে গ্রামোফোন রেকর্ডে গান শোনার দুর্লভ সুযোগ ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ।