মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায়ই নিয়মনীতিকে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা রাখেন—এ বাস্তবতা ইরান গভীরভাবে উপলব্ধি করেছে। আর এখন তেহরান ট্রাম্পের সেই একই নিয়মকেই হাতিয়ার করে তাঁর সঙ্গেই এক ধরনের কৌশলী লড়াইয়ে নেমেছে। গত সোমবার ট্রাম্প অভিযোগ তোলেন, প্রতিশ্রুতি রক্ষার বিষয়ে ইরানকে বিশ্বাস করা অসম্ভব। যুদ্ধ সাময়িক স্থগিত রাখার সমঝোতা স্মারকের প্রসঙ্গ টেনে ফক্স নিউজের কাছে তিনি মন্তব্য করেন, ‘এটি ছিল চূড়ান্ত একটি চুক্তি, কিন্তু তারা সেটি ভঙ্গ করেছে। তারা সব সময়ই চুক্তি ভঙ্গ করে।’ অথচ প্যারিস জলবায়ু চুক্তিসহ একাধিক আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে নিজেই বেরিয়ে যাওয়ার দীর্ঘ রেকর্ড রয়েছে ট্রাম্পের। তিনিই এখন ইরানকে চুক্তি ভঙ্গের জন্য অভিযুক্ত করছেন। সমালোচকদের একাংশ অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান জটিলতার জন্য ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের একটি সিদ্ধান্তকেই দায়ী করবেন, যে সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি ওবামা আমলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার চুক্তিটি বাতিল করেছিলেন। ক্ষুব্ধ ট্রাম্প পরবর্তী সময়ে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর ওপর নিজস্ব মাশুল আরোপের ঘোষণা দিলে তেহরান সেটিকে সরাসরি ব্যঙ্গ করে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক মাধ্যম এক্সে লেখেন, ‘ট্রাম্প একেবারে সঠিক বলেছেন। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে যাতায়াতের জন্য মাশুল নেওয়ার বিষয়ে তেহরানের অবস্থানকে তিনি নিজেই বৈধতা দিয়ে দিয়েছেন।’ তিনি আরও খোঁচা দিয়ে বলেন, ‘ট্রাম্প যে ২০ শতাংশ মাশুল চান, তা কিছুটা বেশি হয়ে যায়। আমরা ন্যায্য আচরণই করব।’ ট্রাম্প এখন উপলব্ধি করছেন, ইরান সহজে ছাড় দেওয়ার পাত্র নয়। সমঝোতা স্মারকের বিষয়বস্তু নিয়ে তাদের রয়েছে নিজস্ব ব্যাখ্যা। আর যে যুদ্ধ তিনি বারবার দাবি করেছিলেন ‘ইতিমধ্যেই জিতে গেছেন’, তা কেন তিনি পুনরায় উসকে দিলেন, সে বিষয়ে মার্কিন জনগণের সামনে এখনো কোনো পরিষ্কার ভাষ্য দাঁড় করাতে পারেননি। ঘটা করে স্বাক্ষরিত এক সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি চিরতরে বন্ধ করা হয়েছে এবং তিন হাজার বছরের মধ্যে প্রথমবার মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি এসেছে বলে ঘোষণার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরই ট্রাম্পের সুর বদলে যায়। সোমবার হিউ হিউইটের রেডিও অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ওই চুক্তিটি ছিল ইরানের জন্য একটি পরীক্ষা, যেখানে তারা ব্যর্থ হয়েছে এবং চুক্তিটির তেমন কোনো গুরুত্বই ছিল না। সমালোচকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প এখন এক ধরণের অচলাবস্থায় বন্দী এবং যুদ্ধের বাস্তবতা পরিবর্তনে অক্ষম। সমঝোতা স্মারক ভেঙে পড়ার পেছনে বড় কারণ, ইরান এই সংঘাতে নিজেদের সবচেয়ে বড় অর্জন—হরমুজের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ—টিকিয়ে রাখতে মাঠে নেমেছে। আর এতে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কঠিন এক বাস্তবতা উন্মোচিত হয়েছে। ট্রাম্পের নিরন্তর হুমকি ও বিপুল সামরিক শক্তি সত্ত্বেও তেহরানই এখনো এ লড়াইয়ের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে চলেছে। ইচ্ছাশক্তির এই নতুন পরীক্ষা আংশিকভাবে তৈরি হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের তাড়াহুড়ো করে একটি অস্পষ্ট ভাষার সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কারণে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বাধীন ট্রাম্পের আবাসন ব্যবসায়ী আলোচকদের দল সম্ভবত সেই দিকটি ধরতে ব্যর্থ হয়, যা ইতিহাস ও কূটনীতিতে পোক্ত সমালোচকেরা তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পেরেছিলেন: ইরান এটিকে নতুন সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে। উদাহরণস্বরূপ, চুক্তিতে তেহরানকে ৬০ দিনের জন্য প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার কথা বলা হয় এবং ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে এর ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক পরিষেবা নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়। বাহ্যিকভাবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদা পূরণ করে—প্রণালির স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখা। কিন্তু ইরান সম্ভবত এটিকে একটি স্থায়ী চুক্তির আওতায় নৌপথটির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি হিসেবেই দেখছে। ফলে তারা যে নতুন স্থিতাবস্থা নিজেদের অনুকূলে সাজাতে লড়াই করবে, তা বিস্ময়কর নয়। এই ভুলটি আগের আরেকটি ভুলকে প্রকট করেছে: ইরান যে প্রথমেই প্রণালিটি বন্ধ করে দিতে পারে, তা আঁচ করতে না পারা। সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের এক মাস পরও বিষয়টি সমস্যা হয়ে থাকাটা প্রমাণ করে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ পূর্ণাঙ্গ চুক্তির জন্য বরাদ্দ ৬০ দিনের সময়সীমা ছিল চরম অবাস্তব। ইরানের আচরণ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের এই হিমশিম অবস্থা ট্রাম্পের পুনরায় যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন আরও ঘনীভূত করছে। যেমন, ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা এবং ট্রাম্পের পুনরায় নৌ-অবরোধ আরোপ নতুন ইরানি নেতৃত্বের ক্যালকুলেশন বদলাতে আগের চেয়ে বেশি সফল হবে বলে বিশ্বাস করার কোনো যুক্তি আছে কি? সর্বোপরি, হরমুজ আবার বন্ধ করতে ইরানের প্রয়োজন হয়েছিল মাত্র কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন। এছাড়া, দ্রুত বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক ক্ষতি কি প্রেসিডেন্টকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য এড়াতে আবার চোখ রাঙানির মুখে পিছু হটতে বাধ্য করবে, যে মূল্য তিনি গত মাসে স্পষ্টভাবে দিতে রাজি নন বলে জানিয়েছিলেন? সর্বাত্মক যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হতে পারে—এমন আশার একটি কারণ হলো, নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষ সম্ভবত ইঙ্গিত দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই ভবিষ্যৎ কূটনীতির পট প্রস্তুত করতে সমঝোতা স্মারকের নিজ নিজ ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে, মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে ইরানের তেল উৎপাদনকেন্দ্র খারগ দ্বীপে আক্রমণের মতো বড় পদক্ষেপের ক্ষেত্রে মার্কিন সেনাদের বিপুল হতাহতের ঝুঁকি নিতে ট্রাম্প কোনো আগ্রহ দেখাননি। ইতোমধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রের রণকৌশল বর্তমানে এমন একটি সংঘাতের চিত্র তুলে ধরছে, যা পুরোপুরি ফুটন্ত নয়, বরং ধিকিধিকি জ্বলছে। ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের ‘ইরান অ্যান্ড দ্য শিয়া অ্যাক্সিস’ প্রোগ্রামের সিনিয়র গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ সিএনএনের বেকি অ্যান্ডারসনকে কানেক্ট দ্য ওয়ার্ল্ড অনুষ্ঠানে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বর্ধিত হামলা এবং ইরানের প্রতিশোধ সত্ত্বেও কূটনীতির সুযোগ এখনো রয়েছে। তবে প্রতিদিনের পাল্টাপাল্টি হামলায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে এবং তখন নিশ্চিতভাবেই খেলার নিয়ম বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। আর এই নতুন সংঘাত যদি ফুটন্ত অবস্থার ঠিক নিচেই বজায় থাকে, তবু ট্রাম্পকে সেই প্রশ্নের জবাব দিতেই হবে, যা নিয়ে তিনি প্রায় পাঁচ মাস ধরে ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন: তিনি এই যুদ্ধ থেকে কীভাবে বের হবেন?
ট্রাম্পের নিজস্ব কৌশলকেই অস্ত্র বানিয়ে ইরানের দাবার চাল, হরমুজ নিয়ে নতুন সমীকরণ
হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ ও পারমাণবিক সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের অভিযোগের জেরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা নতুন মাত্রা পাচ্ছে। ট্রাম্পের নীতির সমালোচনা করে ইরান জানিয়েছে, তারাই এখন সংঘাতের গতিপথ নির্ধারণ করছে।


