সিলেট নগরের টুকেরবাজারে একটি পুরোনো রেস্তোরাঁ নিত্যদিন ভোরে খোলে এবং চলে রাতের গভীরতা অবধি। সানি রেস্টুরেন্ট নামের এই খাবারদোকানে ফজরের নামাজ শেষ হওয়ার পরপরই দরজা খুলে যায়, আর তারপর ক্রেতাদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে। দিন বাড়ার সাথে সাথে আগত মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে, দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত দোকানের প্রতিটি আসনই পরিপূর্ণ থাকে। রাত দেড়টা বা দুইটা পর্যন্ত এই ব্যস্ততা বজায় থাকে, এরপর সাময়িক বিরতি পড়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য। সপ্তাহের প্রতিটি দিনই এই চিত্র অভিন্ন।

এখানকার সবচেয়ে আকর্ষণীয় পদ হলো খিচুড়ি, যা স্থানীয়দের কাছে ‘ছোলা-পোলাও’ নামে পরিচিত। খিচুড়ির সঙ্গী হিসেবে পরিবেশন করা হয় ছোলা, ডাল, আলুর চপ, আলুর চিপস, বেগুনি ও পেঁয়াজু। পরোটা, সবজি এবং চাও সমান তালে বিক্রি হয়। রেস্তোরাঁর দীর্ঘদিনের কর্মী জসিম উদ্দিন জানান, তিনি প্রায় ১২ বছর ধরে এখানে কাজ করছেন। টুকেরবাজারে আশপাশের গ্রামের চাষিরা প্রতিদিন তাজা শাকসবজি নিয়ে আসেন বিক্রির জন্য। সবজি কিনতে আসা ক্রেতা, এলাকার দোকানি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই নিয়মিত এই দোকানে সকালের নাশতা সারেন।

বিশেষত বিকেল ও সন্ধ্যার দিকে গরম খিচুড়ির চাহিদা তুঙ্গে ওঠে। প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ কাপ চা বিক্রি হয়ে থাকে। রেস্তোরাঁ-সংশ্লিষ্টরা জানান, তাদের প্রধান দুটি মেন্যু হচ্ছে পরোটা ও খিচুড়ি। সাধারণ এক প্লেট খিচুড়ির মূল্য মাত্র ২০ টাকা। ডিম, ডাল, আলুর চপ, আলুর চিপস ও পেঁয়াজু সহযোগে পরিবেশন করলে দাম পড়ে ৫০ থেকে ৫৫ টাকার মধ্যে। এর সাথে বিনামূল্যে দেওয়া হয় কাঁচা মরিচ এবং শীতকালে সালাদ। দৈনিক ২৫ থেকে ৩০ কেজি চালের খিচুড়ি রান্না করতে হয় বিপুল চাহিদা মেটাতে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সানি রেস্টুরেন্ট টুকেরবাজারের সবচেয়ে পুরোনো খাবারদোকানগুলোর একটি। আগে আশপাশে তেমন বড় কোনো বাজার ছিল না, ফলে সুরমা নদীর তীরবর্তী এই বাজারেই কেনাকাটার জন্য মানুষজন ভিড় জমাতেন। ২০২১ সালে টুকেরবাজার সিলেট সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হয়। বর্তমানে বাজারের বিস্তৃতি ঘটলেও সানি রেস্টুরেন্টের জনপ্রিয়তায় কোনো ভাটা পড়েনি। এক বুধবার রাত সাড়ে দশটায় দেখা গেল, রেস্তোরাঁর এক প্রান্তে গরম গরম আলুর চিপস ও পেঁয়াজু ভাজার ধোঁয়া উঠছে। অন্য দিকে কয়েকটি দলে বিভক্ত তরুণেরা খিচুড়ি খেতে খেতে ফুটবল বিশ্বকাপ, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল নিয়ে সরগরম আড্ডায় মেতে আছেন।

আখালিয়া থেকে সবজি কিনতে আসা মহিউদ্দিন নামের এক ক্রেতা জানালেন, টুকেরবাজারে এলে প্রায়ই তিনি এখানকার গরম খিচুড়ি খান। গত সাত-আট বছর ধরে তিনি এই রেস্তোরাঁর নিয়মিত খদ্দের। তার কথায়, এখানকার খিচুড়ির স্বাদ সম্পূর্ণ ভিন্ন।

রেস্তোরাঁর ইতিহাস প্রসঙ্গে বর্তমান স্বত্বাধিকারী কয়েস আহমদ বলেন, নব্বইয়ের দশকে মনির উদ্দিন ‘ঝরনা রেস্টুরেন্ট’ নাম নিয়ে এটি চালাতেন। পরবর্তীতে তার ভাই ইরান উদ্দিন ব্যবসার হাল ধরেন এবং নাম বদলে রাখেন ‘সানি রেস্টুরেন্ট’। বর্তমানে তিনিই এটি পরিচালনার দায়িত্বে আছেন। কয়েস আহমদ আরও জানান, রেস্তোরাঁটির সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠাবর্ষ কারও জানা না থাকলেও এটি যে বহু পুরোনো তাতে সন্দেহ নেই। এখনো অনেক বয়স্ক ক্রেতা আসেন এবং পুরোনো দিনের স্মৃতি রোমন্থন করেন। পাশাপাশি আধুনিক রেস্তোরাঁর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় আগের তুলনায় ক্রেতা কিছুটা হ্রাস পেলেও, খাবারের স্বাদ ও গুণমান বজায় রাখার প্রয়াস অব্যাহত রেখেছেন তারা।