মহাকাশে এক অসাধারণ ঘটনার সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা—ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩০ হাজার আলোকবর্ষ দূরে ভাসমান এক বিশাল ‘ভবঘুরে’ কৃষ্ণগহ্বর আবিষ্কৃত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ নর্থ ক্যারোলাইনা অ্যাট চ্যাপেল হিলের একদল বিজ্ঞানী এই আবিষ্কার করেছেন, যা অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স-এ প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সাইট নোরিজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্ট’ বা টিডিই নামের এক বিরল মহাজাগতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই গবেষণা পরিচালিত হয়।

যখন কোনো তারা ধীরে ধীরে একটি বৃহৎ কৃষ্ণগহ্বরের নিকটে পৌঁছে যায়, তখন কৃষ্ণগহ্বরের প্রচণ্ড অভিকর্ষজ টানে তারাটি মুহূর্তেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় এবং এক তীব্র আলোর ঝলকানি সৃষ্টি করে। এই আলোক ঝলকানিই সাধারণত অদৃশ্য কৃষ্ণগহ্বরটিকে ক্ষণিকের জন্য দৃশ্যমান করে তোলে। মহাকাশে এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত বিরল; গড়ে প্রতি এক লাখ বছরে একটি ছায়াপথে মাত্র একবার এমন ঘটনা ঘটে। বিগত দশকে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা শতাধিক টিডিই শনাক্ত করলেও সেগুলোর প্রায় সবই ঘটেছিল ছায়াপথের কেন্দ্রস্থলে, যেখানে সবচেয়ে বড় কৃষ্ণগহ্বরগুলো অবস্থান করে বলে ধারণা করা হয়।

নতুন আবিষ্কৃত ‘টিডিই ২০২৫এবিসিআর’ ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী। এটি ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে ৩০ হাজার আলোকবর্ষ দূরে সংঘটিত হয়েছে—যা দৃশ্যমান আলোয় শনাক্ত হওয়া যেকোনো টিডিই-র মধ্যে সর্বোচ্চ দূরত্বের রেকর্ড। এই আবিষ্কার সূর্যের ভরের প্রায় ১০ লাখ গুণ বিশাল এক ‘ভবঘুরে’ কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, বহুকাল আগে দুটি ছায়াপথের সংঘর্ষ ও একীভূত হওয়ার পর এই কৃষ্ণগহ্বরটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অথবা অন্য কোনো বৃহৎ কৃষ্ণগহ্বরের শক্তিশালী অভিকর্ষজ বলের কারণে এটি মূল ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে দূরে ছিটকে পড়তে পারে।

কৃষ্ণগহ্বর নিজস্ব কোনো আলো তৈরি করে না, তাই এদের শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। সাধারণত আশপাশের বস্তুর ওপর তাদের প্রভাব দেখে বিজ্ঞানীরা এদের উপস্থিতি বুঝতে পারেন। এই ঘটনায় পাশ দিয়ে যাওয়া তারাটির ধ্বংস একটি মহাজাগতিক সার্চলাইটের মতো কাজ করেছে, যা লুকিয়ে থাকা কৃষ্ণগহ্বরটিকে উন্মোচিত করেছে। এই দুরূহ আবিষ্কারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গবেষক দল ‘টিডিইস্কোর’ নামের একটি এআই প্রোগ্রাম ব্যবহার করে দূরবীক্ষণ যন্ত্রের বিশাল তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে টিডিই শনাক্ত করেছেন। এই এআই সিস্টেমটি বিশেষভাবে ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে দূরের অঞ্চলগুলোতে নজর দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছিল, যা প্রচলিত অনুসন্ধান পদ্ধতির বাইরে গিয়ে এই বিরল ঘটনাটি খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়।

এআই যখন অস্বাভাবিক আলোর ঝলকানি শনাক্ত করে, তখন চিলির ‘সাউদার্ন অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল রিসার্চ’ টেলিস্কোপ ব্যবহার করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এর সঠিক প্রকৃতি নিশ্চিত করেন। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, উজ্জ্বল সেই স্ফুলিঙ্গটিতে বৃহৎ কৃষ্ণগহ্বরের কারণে সৃষ্ট টিডিই-র সব বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান। এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, পৃথিবীভিত্তিক অপটিক্যাল টেলিস্কোপ দিয়েও মহাকাশের ভবঘুরে কৃষ্ণগহ্বর খুঁজে বের করা সম্ভব। এ পর্যন্ত একাকী এসব কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে গবেষণা কঠিন ছিল, কারণ পাশ দিয়ে যাওয়া কোনো তারাকে ধ্বংস না করা পর্যন্ত এরা প্রায় পুরোপুরি অদৃশ্যই থাকে।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই সন্ধান কেবল শুরু। ‘ভেরা সি. রুবিন অবজারভেটরি’ ও ‘আর্গাস অ্যারে’-র মতো নতুন পর্যবেক্ষণাগার চালু হলে প্রতি বছর শত শত বা হাজার হাজার টিডিই আবিষ্কৃত হতে পারে। এই অগ্রগতি গবেষকদের আরও অনেক ভবঘুরে কৃষ্ণগহ্বর খুঁজে পেতে এবং কোটি কোটি বছর ধরে এগুলো কীভাবে তৈরি হয়, বড় হয় ও ছায়াপথে ঘুরে বেড়ায় তা বুঝতে সাহায্য করবে। অদৃশ্য কৃষ্ণগহ্বর উন্মোচনের পাশাপাশি এই মহাজাগতিক বিস্ফোরণ তারার জীবনচক্র, ছায়াপথের বিবর্তন ও চরম অভিকর্ষীয় বল নিয়ে গবেষণার সুযোগ তৈরি করছে—যে বল পৃথিবীর কোনো গবেষণাগারে তৈরি করা অসম্ভব। প্রতিটি নতুন টিডিই রহস্যের নতুন জট খুলছে, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মহাবিশ্বের লুকিয়ে থাকা ইতিহাস উন্মোচনে সহায়তা করছে।