যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে টেসলার ফুল সেলফ-ড্রাইভিং (এফএসডি) প্রযুক্তি পরীক্ষা কার্যক্রমের তত্ত্বাবধানে থাকা এক সাবেক ম্যানেজার কোম্পানিটির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন। প্রযুক্তি সংবাদমাধ্যম এনগ্যাজেটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হ্যাভিয়ার মেডরানো নামের ওই কর্মকর্তা তার মামলায় অভিযোগ করেছেন যে, প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার গুরুতর ত্রুটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করার পর তাকে প্রতিশোধমূলকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট সর্বপ্রথম এই মামলার খবর প্রকাশ করে।
মেডরানোর বক্তব্য অনুযায়ী, টেসলা চালকবিহীন রোবোট্যাক্সি প্রযুক্তি উন্নয়নে প্রয়োজনীয় বাজেট বাড়াতে বা অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ দিতে অনিচ্ছুক ছিল, যার ফলে রাস্তায় চলাচলকারী গাড়িগুলো ‘চলন্ত ঝুঁকিতে’ পরিণত হয়েছিল। মামলার নথি থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত তিনি টেসলার এফএসডি সফটওয়্যার পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত সেইফটি অপারেটরদের একটি দলের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার দায়িত্বের মধ্যে ছিল গাড়ি চালনার ভিডিও ক্লিপ অডিট করা, প্রতি সপ্তাহে সরেজমিনে গাড়িতে উঠে নিরাপত্তা তদারকি করা এবং নির্দিষ্ট সময়ে অন-কলে জরুরি সেবা নিশ্চিত করা।
সমস্যার সূত্রপাত হয় যখন তার অধীনে অপারেটরের সংখ্যা বেড়ে ৩৮ জনে দাঁড়ায়। টেসলার অটো পাইলট ডিরেক্টর পিট শিউটজো নিজেই প্রতি ১৫ জন অপারেটরের জন্য একজন ম্যানেজার রাখার নীতি নির্ধারণ করেছিলেন। মেডরানো দাবি করেন, তিনি শিউটজোর কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছিলেন যে একজন ম্যানেজারের অধীনে এত সংখ্যক অপারেটর থাকার কারণে তার ‘ঠিকমতো খাওয়া ও ঘুমানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে’। জবাবে শিউটজো বিষয়টি হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেন, “তোমাকে দেখে তো মনে হচ্ছে না যে তুমি পানিতে ডুবছ।”
মামলায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, মেডরানোর উদ্বেগ উপেক্ষা করায় টেসলা শেষ পর্যন্ত ‘পর্যাপ্ত বাজেট ও কর্মীহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থার’ চরম ব্যর্থতার শিকার হয়। এর পরিণতি হিসেবে মেডরানোর তত্ত্বাবধানে থাকা অবস্থাতেই একটি মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে। নথি অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় মেডরানো ‘শারীরিকভাবে ঘুমে আচ্ছন্ন’ ছিলেন, যার ফলে তিনি দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ির অপারেটরকে ভুল ও ঝুঁকিপূর্ণ নির্দেশনা দেন। এ কারণে ওই নারী অপারেটর প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ঝুঁকিপূর্ণ দুর্ঘটনাস্থলে অবস্থান করতে বাধ্য হন, যেখানে একজন অসচেতন ব্যক্তি তাকে বিরক্ত করতে আসে।
ঘটনার পর মেডরানো নিরাপত্তা ত্রুটিগুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর উদ্যোগ নেন এবং প্রমাণ দেন যে হিউস্টন অঞ্চলের জন্য টেসলা প্রয়োজনীয় সম্পদ ও কর্মী বরাদ্দ দিচ্ছে না। তবে এই পদক্ষেপ নেওয়ার পরপরই তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয় বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে। বেআইনিভাবে প্রতিশোধমূলক বরখাস্তের প্রতিকার হিসেবে মেডরানো তাকে আগের পদে পুনর্বহাল করার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি না হওয়া শেয়ারের ক্ষতিপূরণ, বকেয়া ও ভবিষ্যৎ বেতন এবং ‘মানসিক যন্ত্রণা, পারিবারিক টানাপোড়েন ও তীব্র আর্থিক অনটনের’ ক্ষতিপূরণ বাবদ অর্থ দাবি করেছেন।
এদিকে, টেসলার চালকহীন গাড়ি প্রযুক্তি নিয়ে আগেও সমালোচনা হয়েছে। মে মাসে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, টেসলা সম্ভবত তাদের এফএসডি সফটওয়্যারের নিরাপত্তা নিয়ে অতিরঞ্জিত করছে। টেসলা গাড়ির ক্যামেরা ফুটেজ পর্যালোচনাকারী কর্মীদের বরাতে রয়টার্স জানায়, এফএসডি প্রযুক্তি অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ ট্রাফিক নিয়ম মানতেও ব্যর্থ হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হাইওয়ে ট্রাফিক সেইফটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনও (এনএইচটিএসএ) এই প্রযুক্তির নিরাপত্তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে চালকের নজরদারি সাপেক্ষে টেসলার এফএসডি সফটওয়্যার ব্যবহারের অনুমতি থাকলেও একাধিক দুর্ঘটনা, রোবোট্যাক্সি চালুতে ধীর গতি এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাগত সংকট সব মিলিয়ে কোম্পানিটির প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ সাফল্য এখন অনিশ্চিত।




