মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্পদ পরিচালনাকারী ট্রাস্ট এক জরুরি আবেদনের মাধ্যমে তাঁর আর্থিক নথিপত্র বিবিসির কাছে হস্তান্তরের আদেশ স্থগিত রাখতে বলেছে। আদালতের নির্দেশ বলবৎ থাকলে বৃহস্পতিবারের মধ্যে এই তথ্য প্রকাশ করতে হতো, যা ট্রাম্পের ব্যক্তিগত অর্থসংস্থানকে আড়াল করে রাখার শেষ চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিবিসি জানতে চাচ্ছে, ২০২৪ সালের একটি তথ্যচিত্র আদৌ তাঁর ১০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি করেছে কিনা।

এই ১০ বিলিয়ন ডলারের মানহানির মামলাটি একটি তথ্যচিত্রকে কেন্দ্র করে, যেখানে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ট্রাম্পের দেওয়া ভাষণ বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। বিবিসি দাবি করেছে, ব্যবসা ও ব্র্যান্ডের প্রকৃত ক্ষতি প্রমাণে ট্রাম্পের আর্থিক নথি প্রয়োজন। এর জবাবে ট্রাম্পের ট্রাস্টের কৌঁসুলিরা যুক্তি দিয়েছেন, ‘নথিগুলো একবার প্রকাশ হয়ে গেলে কোনো আদেশই আর সেগুলোর প্রকাশকে অবিকৃত করতে বা সেগুলো সংকলনের ব্যয় ফিরিয়ে দিতে পারবে না’, যদি আদালত পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেয় যে সেগুলোঁ প্রয়োজন ছিল না।

বিকল্প পথ হিসেবে ট্রাম্প তাঁর প্রাথমিক মামলার যুক্তি সংশোধনেরও চেষ্টা করছেন। নতুন অবস্থান অনুযায়ী, বিবিসির তথ্যচিত্র শুধুমাত্র তাঁর ব্যক্তিগত সুনাম ক্ষুণ্ণ করেছে, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নয়। ট্রাস্টের মতে, এই সংশোধনী আর্থিক নথি প্রদানের প্রয়োজনীয়তাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলবে।

বিবিসির দাবিকৃত আর্থিক নথির পরিধি ব্যাপক। এতে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত কর রিটার্ন থেকে শুরু করে প্রায় ৪০০ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মূল্যদ তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে। তবে বিচারক এনজোলিক এ. লেট ইতিমধ্যে প্রাথমিক দাবি সীমিত করে শুধুমাত্র ২০২৩ সাল থেকে পরবর্তী সময়ের নথি হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন। দাবির তালিকায় রয়েছে ট্রাস্টের মোট মূল্য, সকল সম্পদ ও সম্পত্তি, ট্রাস্ট গঠনের চুক্তি, প্রতি বছর এর মূল্য কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, নির্দিষ্ট সম্পত্তির দলিল, মেধাসম্পদ এবং ‘মোটরযান, গহনা, শিল্পকর্ম, অ্যান্টিক ও সংগ্রহযোগ্য’র মতো বাস্তব ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিবরণ। এছাড়াও রয়েছে ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল, ট্রাম্প মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলজি গ্রুপ এবং ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের মতো সংস্থাগুলোর তথ্য।

আদেশ স্থগিতের বিরোধিতা করে বিবিসি আদালতকে জানিয়েছে, ‘এটি আদালতের পরিষ্কার ও সরাসরি নির্দেশ এড়ানোর একটি স্বচ্ছ চেষ্টা।’ তাদের ভাষ্য, ট্রাম্পের ট্রাস্ট মামলা দায়েরের পর থেকে একইভাবে তথ্য প্রদানে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। তারা আরও বলে, ‘ট্রাম্প ট্রাস্ট শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করায় এই জরুরি অবস্থা তৈরি হয়েছে, অথচ মৌখিক ও লিখিত নির্দেশ পাওয়ার পর সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে।’

বিচারক আবেদনটি নাকচ করলে কবে নাগাদ বিবিসি তথ্য পাবে, তা অনিশ্চিত। ট্রাম্প ট্রাস্টের আবেদন, আদালত সংশোধিত অভিযোগের পর প্রতিক্রিয়া জানানোর ১৪ দিন পর এবং সব আপিল শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্থগিতাদেশ বহাল থাকুক। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কয়েক মাস লেগে যেতে পারে। ফোর্বসের হিসাব মতে, বুধবার বিকেল পর্যন্ত ট্রাম্পের মোট স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মূল্য ছিল ৬.৫ বিলিয়ন ডলার, যার পুরোটাই ট্রাস্টের নিয়ন্ত্রণে।

মামলাটিতে কিছু নথি জনসমক্ষে আসা থেকে রক্ষা করার বনদবস্তি থাকলেও, প্রাপ্ত তথ্যগুলোর সারাংশ ভবিষ্যতের আদালতের নথিপত্রে প্রতিফলিত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। বিবিসির অবস্থান, ট্রাম্পের ১০ বিলিয়ন ডলারের দাবি অযৌক্তিক প্রমাণে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ট্রাম্প তাঁর প্রথম নির্বাচনের পর ব্যবসা থেকে দূরত্ব তৈরি করতে এই পরিবর্তনযোগ্য ট্রাস্টটি গঠন করেছিলেন, যদিও তিনি তা থেকে সম্পদ সরাননি। তাঁর ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ট্রাস্টটি নিয়ন্ত্রণ করেন, এবং ট্রাম্পই একমাত্র ব্যক্তি যিনি এতে সম্পদ যোগ বা সুবিধা পেতে পারেন। ২০২৪ সালের বিবিসির ‘প্যানোরামা’ তথ্যচিত্রটি সম্পাদনার জন্য ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ট্রাম্প এই মামলা করেন। এতে ট্রাম্পের ৬ জানুয়ারির বক্তব্য ভুলভাবে উদ্ধৃত করে এমন ধারণা দেওয়া হয় যে তিনি সহিংস পদক্ষেপের ডাক দিয়েছিলেন। পরবর্তী বিবিসি ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইলেও, তারা এই তথ্যচিত্র মানহানিকর ছিল না বলে অবস্থানে অটল রয়েছে।