দেশের ফ্রিল্যান্সার ও ব্যক্তিগত সেবা রপ্তানিকারকদের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে গতি ও স্বচ্ছতা আনতে সম্প্রতি একটি সমন্বিত রূপরেখা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি ডিপার্টমেন্ট (এফইপিডি) থেকে সব অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকে পাঠানো সার্কুলার (এফইপিডি-১/২২)-এ আগের বিভিন্ন নির্দেশনাকে একীভূত করে নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে। এই নির্দেশনায় আইসিটি সেবা, বিপিও এবং অনলাইনে পেশাদার সেবা প্রদানকারীদের অর্থ প্রত্যাবাসন ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের নিয়ম স্পষ্ট করা হয়েছে।
নতুন নিয়মে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো ইএক্সপি ফর্মের বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া। ডিজিটাল মাধ্যমে সেবা রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রথাগত কাগুজে ইএক্সপি ফর্মের প্রয়োজন নেই। এখন ই-মেইল, ডিজিটাল চুক্তিপত্র, ই-ইনভয়েস, ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মের ডিজিটাল স্টেটমেন্ট এবং ব্যাংকিং ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্স বার্তাকে লেনদেনের বৈধ প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যাবে।
রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে সি-ফর্ম শিথিল করে সর্বোচ্চ ২০ হাজার মার্কিন ডলার (বা সমপরিমাণ মুদ্রা) পর্যন্ত ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্সের জন্য আর সি-ফর্ম জমা দিতে হবে না। এর বেশি হলে গ্রাহকরা অনলাইন বা ডিজিটাল ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে সহজে অনলাইন সি-ফর্ম পূরণ করে দ্রুত অর্থ জমা করতে পারবেন।
অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে ব্যবহারকারীদের জন্য সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। স্বীকৃত অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে সেবা প্রদানকারীদের (ওপিজিএসপি) মাধ্যমে প্রতি লেনদেনে সর্বোচ্চ ১০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত আয় দেশে আনা যাবে। ফ্রিল্যান্সাররা অনুমোদিত ব্যাংক থেকে ‘ডিজিটাল ডুয়েল-কারেন্সি ফ্রিল্যান্সার কার্ড’ নিতে পারবেন। এছাড়াও বিকাশ, রকেটের মতো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের (পিএসপি) মাধ্যমে সরাসরি ডিজিটাল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সেবা আয় জমা করার সুযোগ থাকবে।
আইসিটি ও সফটওয়্যার খাতের রপ্তানিকারকেরা তাদের অর্জিত নিট আয়ের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ ‘এক্সপোর্টার্স রিটেনশন কোটা (ইআরকিউ) অ্যাকাউন্টে বৈদেশিক মুদ্রায় (মার্কিন ডলার) জমা রাখতে পারবেন। অন্যান্য পেশাদার সেবার ক্ষেত্রে এই সীমা ৩০ শতাংশ। অবশিষ্ট অর্থ স্থানীয় মুদ্রা টাকায় রূপান্তর করতে হবে। ইআরকিউ অ্যাকাউন্টের বৈদেশিক মুদ্রা সফটওয়্যার রেজিস্ট্রেশন, ডোমেইন বা হোস্টিং ফি, সার্ভার মেইনটেন্যান্স, বৈশ্বিক সরঞ্জাম আমদানি ও পেশাগত বিদেশি ভ্রমণসহ বৈধ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা যাবে।
তবে বিজ্ঞপ্তিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, অর্জিত রপ্তানি আয় বিদেশে অন্য কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, সম্পদ বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো ভার্চুয়াল অ্যাসেটে জমিয়ে রাখা ‘ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট, ১৯৪৭’-এর লঙ্ঘন এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। ব্যাংকগুলোকে এএমএল/সিএফটি ও কেওয়াইসি নীতিমালা কঠোরভাবে মেনে চলার এবং যথাযথ উৎসে কর কর্তন নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কন্ট্যাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিংয়ের (বাক্কো) সাধারণ সম্পাদক ফায়সাল আলিম মনে করেন, এই উদ্যোগ ফ্রিল্যান্সারদের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা দূর করবে এবং আইসিটি খাতের রপ্তানি আয় বাড়াবে। তবে জায়ান্ট মার্কেটার্সের প্রতিষ্ঠাতা মাসুম বিল্লাহ ভূঁইয়া বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ইআরকিউ অ্যাকাউন্ট এখনো শুধু এডি শাখা থেকে খোলা যায়, জেলা শহরের অনেক শাখায় এই সুবিধা নেই। এছাড়া সার্কুলারে ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত সি-ফর্ম ছাড়ের কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক ব্যাংক ৫০০-১০০০ ডলারের রেমিট্যান্সের জন্যও সি-ফর্ম চাচ্ছে।
টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সার ও টিম ম্যাভিনের কাজী মামুন বলেন, ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত সি-ফর্ম ছাড় এবং ইআরকিউ অ্যাকাউন্টে ৫০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা রাখার সুযোগ প্রশংসনীয়। তবে ইআরকিউ অ্যাকাউন্ট থেকে হঠাৎ করে ডলারকে টাকায় রূপান্তরের সিদ্ধান্ত না নেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি। তিনি বিদেশে অর্থ রাখার ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞাকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাধা হিসেবে দেখছেন। কারণ আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য দেশে নিবন্ধিত ব্যবসার অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অপারেশনাল খরচ মেটাতে হয়। তিনি আরও বলেন, ফ্রিল্যান্সারের প্রোফাইল ও কাজের যোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষমতা ব্যাংকের হাতে দেওয়ায় হয়রানির ঝুঁকি রয়েছে, কারণ ব্যাংক কর্মকর্তাদের অনলাইন জটিল কাজের ধরন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই। কর কর্তনের ক্ষেত্রেও বিভ্রান্তি থাকার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ আইটি সেবায় কর মওকুফ থাকলেও ব্যাংক ভুল বুঝে অযথা কর কেটে নিতে পারে।




