২০১৯ সালে বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের সিগনাল ইদুনা পার্কে ১৮ বছর বয়সী এক তরুণ ফুটবলার প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে বারবার বিপর্যস্ত করে তুলছিলেন। গ্যালারিতে উপবিষ্ট সাবেক এক ইংলিশ ডিফেন্ডার তখন মন্তব্য করেছিলেন, এই ছেলেটিই হয়তো একদিন ইংল্যান্ডের সেরা ফুটবলার হিসেবে আবির্ভূত হবে। সেই সময় কেউই কল্পনা করতে পারেননি যে সাত বছর পর সেই একই খেলোয়াড়কে ইংল্যান্ডের দশম বিভাগের কোনো ক্লাবের মাঠে অনুশীলন করতে দেখা যাবে। জেডন সানচোর ক্যারিয়ারের এই উত্থান-পতনের গল্প পেশাদার ফুটবলের কঠিন বাস্তবতাকে সামনে তুলে ধরে — শুধু প্রতিভা নয়, মানসিক চাপ সামলানোর ক্ষমতাও যে অপরিহার্য।
মাত্র ১৭ বছর বয়সে ম্যানচেস্টার সিটির যুব একাডেমি ত্যাগ করে ডর্টমুন্ডে পাড়ি জমানো ছিল সানচোর জন্য এক বিশাল ঝুঁকি। তবে সেই ঝুঁকিই তার ক্যারিয়ারকে নতুন মোড় দেয়। বুন্দেসলিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগে দাপটের সঙ্গে খেলে ১৩৭ ম্যাচে ১১৪টি গোল ও অ্যাসিস্টে সরাসরি অবদান রেখেছিলেন তিনি। এমন অসামান্য পারফরম্যান্সের স্বীকৃতিস্বরূপ ইংল্যান্ডের তৎকালীন কোচ গ্যারেথ সাউথগেট তাকে জাতীয় দলে ডাকেন।
এই সাফল্যের ওপর ভিত্তি করেই ২০২১ সালের গ্রীষ্মে প্রায় ৭৩ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড সানচোকে দলে ভিড়ায়। কিন্তু শুরু থেকেই প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয় তাকে। তৎকালীন কোচ ওলে গানার সুলশার তাকে ডান প্রান্তে খেলানোর পরিকল্পনা করেছিলেন, অথচ সানচোর পছন্দ ছিল বাঁ প্রান্ত। এদিকে কানের সংক্রমণে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় দলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হয়। কোচ পরিবর্তন ও দলীয় অস্থিরতার মধ্যে প্রথম মৌসুমেই ছন্দ হারান তিনি।
এরিক টেন হাগের অধীনে ২০২২-২৩ মৌসুমের সূচনা কিছুটা আশাপ্রদ ছিল — লিভারপুল ও লেস্টারের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ গোলও করেন। তবে অক্টোবরের পর থেকে ফর্ম ও আত্মবিশ্বাস দুই-ই হারিয়ে ফেলেন। ২০২২ বিশ্বকাপের দল থেকে বাদ পড়ার পর তিন মাস ব্যক্তিগত অনুশীলন কর্মসূচিতে কাটান, যা ক্লাব কর্তৃপক্ষ ‘শারীরিক ও মানসিক’ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে। আর্সেনালের বিপক্ষে ম্যাচের দল থেকে বাদ পড়েন সানচো এবং টেন হাগ প্রকাশ্যে তার অনুশীলনের পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনা করেন। জবাবে সানচো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তাকে ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হচ্ছে। মাফ চাইতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে দল থেকেই বাদ দেওয়া হয়; এমনকি প্রথম দলের ক্যানটিনেও প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। এরপর টানা চার মাস তাকে একা বা একাডেমি খেলোয়াড়দের সঙ্গে অনুশীলন করতে হয়। এই বিবাদই যেন তার ইউনাইটেড অধ্যায়ের সমাপ্তি ত্বরান্বিত করে।
এরপর ধারে ফেরেন ডর্টমুন্ডে, তারপর চেলসি ও অ্যাস্টন ভিলায় — টানা তিনটি ধারের মৌসুমে তিনটি ভিন্ন ইউরোপীয় ফাইনালে খেলার বিরল কীর্তি গড়েন। কিন্তু কোনো দলেই নিজের সেরা ছন্দে ফিরতে পারেননি। বর্তমানে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন না হওয়ায় তিনি ফ্রি এজেন্ট। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি ক্লাবের সঙ্গে তার আলোচনা চলছে বলে খবর; ডর্টমুন্ডও তাকে ফেরানোর কথা ভাবছে, যদিও তার ফিটনেস ও সাম্প্রতিক ফর্ম নিয়ে সংশয় রয়েছে। ইংল্যান্ডের দশম বিভাগের এক ক্লাবের মাঠে তার অনুশীলনের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ক্লাবটিকে ব্যাখ্যা দিতে হয় যে এটি ছিল নিছক ব্যক্তিগত অনুশীলন। ২৬ বছর বয়সে সানচো নিজেকে হারিয়ে খুঁজছেন — এ যেন এক সময়ের প্রতিভাবান তারকার মর্মান্তিক পতনকাহিনি।




