কক্সবাজারের উখিয়ার তরুণ মিজানুর রহমান (২১) সৌদি আরবে চাকরির জন্য পাসপোর্ট করতে গিয়ে হঠাৎই এক অপ্রত্যাশিত বাধার মুখে পড়েন। জাতীয় পরিচয়পত্রসহ তার সব কাগজপত্র ঠিক থাকলেও পাসপোর্ট অফিসে আঙুলের ছাপ দেওয়ার পর তার তথ্য রোহিঙ্গাদের নিবন্ধিত ডেটাবেইসে ধরা পড়ে। ফলে স্থগিত হয়ে যায় তার আবেদন। উখিয়ার লম্বাশিয়া আশ্রয়কেন্দ্রের (ক্যাম্প-৪) স্থানীয় বাংলাদেশি বাসিন্দাদের পাড়ায় গিয়ে জানা গেছে, মিজানুরের বাবা মোস্তাক মিয়া (৫০) বাংলাদেশি নাগরিক এবং ক্যাম্প গড়ে ওঠার আগে থেকেই সেখানে বসবাস করছেন। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের সময় তিনি নিজ বাড়িতে তিনটি শরণার্থী পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। পরে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দিতে নিবন্ধন করলে মোস্তাক মিয়া তার স্ত্রী ও চার সন্তানসহ পুরো পরিবার নিয়ে নিবন্ধিত হন। ফলে দিনমজুর মোস্তাক মিয়ার পুরো পরিবারের নাম রোহিঙ্গা তথ্যভান্ডারে সংরক্ষিত হয়ে যায়। সরকার এখন অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (এপিআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ডেটাবেইজকে জাতীয় পরিচয়পত্রের সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই কারণে মিজানুর আঙুলের ছাপ দিলে রোহিঙ্গা তথ্যভান্ডারে তার নাম শনাক্ত হয় এবং কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস তাকে ফেরত পাঠায়। গত জুলাইয়ের শুরুতে পাসপোর্ট করতে গিয়ে এই জটিলতায় পড়েন মিজানুর। এরপর ইউএনএইচসিআরের শরণার্থী ডেটাবেইস থেকে নাম বাতিল করতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কাছে আবেদন করেছেন তিনি, তবে এখনো কোনো অগ্রগতি হয়নি। মোস্তাক মিয়া জানান, প্রায় ৯ বছর ধরে তার পরিবার ত্রাণ সহায়তা পেয়ে আসছে; নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট নিয়ে এ রকম জটিলতা হবে তা তিনি কল্পনাও করেননি। উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হেলাল উদ্দিন জানান, মিজানুরের মতো তার ওয়ার্ডের অন্তত ৩০ জন বাংলাদেশি নাগরিক এই জটিলতায় পড়েছেন। তাদের নাম শরণার্থী তালিকা থেকে বাদ দিতে তিনি নিজে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে সুপারিশ করেছেন। উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী জানান, তার ইউনিয়ন থেকে ইতিমধ্যে ৫০ থেকে ৬০টি আবেদন জেলা প্রশাসন এবং শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। বিশেষ করে যারা ২০১৭ সালে শিশু ছিলেন, এখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে পাসপোর্ট করতে গিয়ে তারা জানতে পারছেন সরকারি নথিতে তারা রোহিঙ্গা হিসেবে নিবন্ধিত। কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক মো. মোবারক হোসেন বলেন, ত্রাণের আশায় অনেক বাংলাদেশি আশ্রয়শিবিরে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করেছেন। পাসপোর্ট করতে এলে ফিঙ্গারপ্রিন্টের সময় তাদের নাম রোহিঙ্গাদের তথ্যভান্ডারে প্রদর্শিত হয়। তখন সেই বাংলাদেশিকে পাসপোর্ট না দিয়ে রোহিঙ্গা তথ্যভান্ডার থেকে নাম বাদ দিয়ে প্রমাণপত্র আনার পরামর্শ দেওয়া হয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, কেউ যদি জাল এনআইডি বানিয়ে পাসপোর্ট করতে আসেন, তারাও সার্ভারে ধরা পড়ে যাচ্ছেন। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, ত্রাণ পাওয়ার আশায় নিজেকে রোহিঙ্গা হিসেবে নিবন্ধিত করা বেআইনি কাজ। বর্তমানে তার দপ্তরে প্রায় এক হাজার আবেদন জমা পড়েছে। প্রতিটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ শহিদ উল্লাহও জানান, জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলেও যেসব বাংলাদেশি পাসপোর্ট করতে চান, তাদের আগে রোহিঙ্গা ডেটাবেইস থেকে নিজেদের নাম ও তথ্য মুছে ফেলতে হবে; অন্যথায় পাসপোর্ট পাওয়া সম্ভব নয়। উখিয়ার বালুখালী, থাইংখালী, টেকনাফের হ্নীলা, হোয়াইক্যং ও নয়াপাড়া, বাহারছড়ার শীলখালী এলাকায় কয়েক শ বাংলাদেশি ত্রাণ নিতে গিয়ে রোহিঙ্গাদের তথ্যভান্ডারে নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ক্যাম্পের কিছু অসাধু রোহিঙ্গা মাঝি (নেতা) ও বায়োমেট্রিক সেন্টারে দায়িত্বরত কিছু কর্মী মাথাপিছু এক থেকে দেড় হাজার টাকা নিয়ে বাংলাদেশিদের নিবন্ধিত করেছেন। উখিয়ার কুতুপালং ও লম্বাশিয়া আশ্রয়শিবির এলাকার প্রায় ৫০০টি বাঙালি পরিবারের মধ্যে অন্তত ৪২০টি পরিবার রোহিঙ্গাদের ডেটাবেজে নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে। আরআরআরসি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তথ্যভান্ডার থেকে নাম কাটাতে এক হাজার আবেদন জমা পড়েছে। এত দিন রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক ডেটাবেইস ইউএনএইচসিআরের একক নিয়ন্ত্রণে ছিল; আরআরআরসি কেবল সেই তথ্য দেখার সুযোগ পেত। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) সহায়তায় তৈরি নতুন এপিআই ব্যবস্থায় রোহিঙ্গাদের আঙুলের ছাপের তথ্য এনআইডি ডেটাবেজের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিলছে। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, যাচাই-বাছাইয়ের জন্য আবেদনগুলো জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হচ্ছে; সেখান থেকে যাচাই করে পাঠানো আবেদনগুলোর নাম তথ্যভান্ডার থেকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করে ইউএনএইচসিআরের কাছে পাঠানো হচ্ছে। ইউএনএইচসিআর-বাংলাদেশের যোগাযোগ কর্মকর্তা শারি নিজমান জানান, ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে তথ্য বিনিময়-সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারকের আওতায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নতুন আগত রোহিঙ্গাদের প্রাথমিক বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের তথ্য ইউএনএইচসিআরের কাছে হস্তান্তর করে। ২০১৮ সালের জুন থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার ও ইউএনএইচসিআরের যৌথ যাচাইকরণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তিনি জানান, শরণার্থী নন এমন ব্যক্তিরা যাতে নিবন্ধিত না হন সে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়; সীমিতসংখ্যক মানুষ ভুলবশত নিবন্ধিত হয়ে যান। এমন ঘটনা শনাক্ত হলে তা পর্যালোচনা ও সংশোধনের জন্য সরকার ও ইউএনএইচসিআরের একটি সুস্পষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার যাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করবে, তাদেরই কেবল শরণার্থী নিবন্ধন থেকে বাদ দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
ত্রাণ পেতে রোহিঙ্গা তালিকায় নাম, পাসপোর্টে বিপাকে বাংলাদেশিরা
ত্রাণের আশায় রোহিঙ্গা শিবিরে নিবন্ধন করায় কক্সবাজারের শত শত বাংলাদেশি পরিবার এখন পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্রের জটিলতায় পড়েছে। সরকারের এপিআই প্রযুক্তিতে রোহিঙ্গা ডেটাবেইস এনআইডি সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় আবেদনকারীদের নাম শনাক্ত হচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে ইতিমধ্যে প্রায় এক হাজার আবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে জমা পড়েছে।




