উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আমন ধানের চাষাবাদের সময় সার সরবরাহ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রাজশাহী ও যশোর জেলায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে যে পরিমাণ সার চাওয়া হয়েছিল, তার তুলনায় বরাদ্দ পাওয়া গেছে অনেক কম। এর পরিণতিতে মাঠে কাজ করা চাষিরা সরকার নির্ধারিত পরিবেশকদের কাছে গিয়েও প্রয়োজনীয় ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সার সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউরিয়া সারের চাহিদা ছিল ৩ লাখ ৫ হাজার ৫৪৩ মেট্রিক টন, কিন্তু বরাদ্দ মিলেছে মাত্র ৭১ হাজার ১০৯ মেট্রিক টন। টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘাটতি রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ইউরিয়ার চাহিদা ৭৭ হাজার ৪৭০ মেট্রিক টনের বিপরীতে একই ৭১ হাজার ১০৯ মেট্রিক টন বরাদ্দ পাওয়া গেছে। টিএসপির ২৫ হাজার ৮৮০ মেট্রিক টনের চাহিদার বিপরীতে ১৭ হাজার ২৭৪ মেট্রিক টন, ডিএপির ৫৪ হাজার ৫৩০ মেট্রিক টনের চাহিদার বিপরীতে ৪৯ হাজার ৫৭৮ মেট্রিক টন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগস্ট মাসে রাজশাহীর জন্য ইউরিয়া ৭ হাজার ৫৭৪ মেট্রিক টন বরাদ্দ হলেও ১৮ আগস্ট পর্যন্ত তোলা হয়েছে ৪ হাজার ৭২৪ মেট্রিক টন। ডিএপি ২ হাজার ৬৪৭ মেট্রিক টনের মধ্যে ২ হাজার ১৮২, টিএসপি ১ হাজার ৫১১ মেট্রিক টনের মধ্যে ১ হাজার ২৪০ এবং এমওপি ১ হাজার ৭৬০ মেট্রিক টনের মধ্যে ১ হাজার ৪৯৬ মেট্রিক টন প্রাপ্ত হয়েছে।

যশোর জেলায় ১ লাখ ৩২ হাজার ৬৯২ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে। আগস্ট মাসের জন্য টিএসপি ৩ হাজার ৮২ মেট্রিক টন, ডিএপি ২ হাজার ৭৮২, এমওপি ২ হাজার ৬৩১ এবং ইউরিয়া ১০ হাজার ৭০৪ মেট্রিক টন বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত টিএসপি ২ হাজার ৩৭, ডিএপি ২ হাজার ৪৮৪, এমওপি ১ হাজার ৬২২ এবং ইউরিয়া ৬ হাজার ৯৫ মেট্রিক টন তোলা হয়েছে। সেখানে ৩৪ বস্তা টিএসপি ও ৮ বস্তা ডিএপি অবৈধভাবে মজুত রাখার অভিযোগে একটি প্রতিষ্ঠানকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

মাঠপর্যায়ে কৃষকদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার কাজীহাটা গ্রামের কৃষক বাবলু (৫০) ১০ বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন। নিজ গ্রামের পরিবেশকের কাছে ইউরিয়া না পেয়ে তিনি পাশের দেওপাড়া ইউনিয়নের দোকানে যান। সেখানে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র ২০ কেজি সার দেওয়া হলে অভিমানে তিনি সেটিও নেননি। কদমশহর গ্রামের রাশিদুল ইসলাম নিজ এলাকার বিএডিসির পরিবেশকের কাছে সার না পেয়ে দেওপাড়ার বিসিআইসির দোকানে আসেন। আকবর আলী দুই বস্তা ইউরিয়া পেলেও এক বস্তা ডিএপি পাননি। তিনি বলেন, নিজের টাকা দিয়ে কিনতেও সার পাচ্ছেন না। চারঘাট উপজেলার ভায়ালক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের আকাশ এন্টারপ্রাইজে চাষিরা টিএসপি চাইলে ৫০ কেজির বদলে ২৫ বা ১৫ কেজি পাচ্ছেন। ফরিদপুরের সাইফুল ইসলাম দুই বস্তার জায়গায় ১৫ কেজি, বাঁকড়ার শফিকুল ইসলাম ২৫ কেজি পেয়েছেন। ঝিকরগাছার নারাঙ্গালী গ্রামের আবদুল আলিম (৫৮) চার বিঘা জমিতে চাষ করে খোলাবাজার থেকে ৫২ টাকা কেজি দরে ২০ কেজি টিএসপি এবং প্রতি বস্তা ১ হাজার ৫০০ টাকা দরে দুই বস্তা ইউরিয়া কিনেছেন। তিনি জানান, চারার বয়স ২০ দিন হলেও খেতে সার দিতে পারছেন না।

বিপরীতে, কিছু পরিবেশক কালোবাজারে সার বিক্রি ও অবৈধ মজুদের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গোদাগাড়ীর পালপুর গ্রামের বিএডিসির পরিবেশক আবদুর রহিমের দোকানে কোনো সার না থাকলেও গুদামে প্রায় ১০০ বস্তা এমওপি সার পাওয়া যায়। তিনি দাবি করেন, অন্য পরিবেশকের কাছ থেকে কিনে রেখেছেন। কিন্তু কৃষকদের অভিযোগ, এটি অবৈধ মজুত। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহানের অভিযানে ২২ বস্তা এমওপি জব্দ ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা হয়। একই দিনে কদমশহর এলাকার খায়রুল ইসলামের দোকান থেকে ১৪ বস্তা ইউরিয়া, ৮ বস্তা টিএসপি ও ৮ বস্তা এমওপি জব্দ করে আরও ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। রাজশাহীর চার উপজেলায় গত তিন দিনে চারজন পরিবেশককে মোট ৮৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। যশোরে ২ আগস্ট ভ্রাম্যমাণ আদালত দুই পরিবেশককে ১০ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করেন।

বাজারে দামও নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সরকার নির্ধারিত খুচরা মূল্য প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা, এমওপি ১ হাজার টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকা ও ইউরিয়া ১ হাজার ৩৫০ টাকা। কিন্তু রাজাবাড়ি বাজারের শহিদুল ট্রেডার্সে ডিএপি ১ হাজার ৭৫০ টাকা, ইউরিয়া ১ হাজার ৫০০ টাকা বস্তা বিক্রি হচ্ছে। মালিক সাইদুর রহমান স্বীকার করেন ১ হাজার ৭০০ টাকা বস্তা দরে ডিএপি বিক্রি করেছেন। পাশের সাদ এন্টারপ্রাইজের কর্মচারী বলেন, তাদের ডিএপির মান খারাপ হলেও ১ হাজার ৬০০ টাকা বস্তা বিক্রি হচ্ছে। যশোরের নওয়াপাড়ায় তিউনিসিয়ার কালো টিএসপি ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা, মিসরের ১ হাজার ৭০০, মরক্কোর ১ হাজার ৭৫০ টাকা বস্তা বিক্রি হচ্ছে। জর্ডানের ডিএপি ১ হাজার ৬৫০ ও চীনের ১ হাজার ৫৫০ টাকা বস্তা। এমওপি ১ হাজার ৫০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা। বেসরকারি আমদানিকারকেরা পরিবেশকদের কাছ থেকে সার কিনে বেশি দামে বিক্রি করছেন বলে জানা গেছে।

জেলা পর্যায়ে কর্মকর্তারা ভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছেন। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, চাওয়ার চেয়ে বরাদ্দ কম পাওয়া যায়। পুকুরের জন্যও কোনো বরাদ্দ নেই, অথচ ১৭ হাজার ৭৭৪ হেক্টর পুকুরের জন্য প্রতি তিন মাসে ১ হাজার ৯৯১ মেট্রিক টন ডিএপি প্রয়োজন। জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম দাবি করেন, জেলায় পর্যাপ্ত সার রয়েছে এবং বরাদ্দ কম পাওয়ার বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তবে বেশি দামে বিক্রি বা পাচার হলে তাৎক্ষণিক ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যশোর কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, চলতি আমন মৌসুমে কোনো সংকট নেই এবং কৃষক পর্যাপ্ত সার পাচ্ছেন।

মৌসুমি চাহিদা ও বরাদ্দের এই অসামঞ্জস্যের ফলে রাজশাহীর ৮৩ হাজার ৬০০ হেক্টর এবং যশোরের ১ লাখ ৩২ হাজার ৬৯২ হেক্টর জমির চাষাবাদ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। মধ্য জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চারা রোপণের সময় টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি এবং পরবর্তীতে ইউরিয়া প্রয়োগের প্রয়োজন। কিন্তু বরাদ্দের ঘাটতি ও কালোবাজারের কারণে কৃষকেরা সেই সময়মতো সার পেতে ব্যর্থ হচ্ছেন, যা ফসল উৎপাদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।