পশ্চিমবঙ্গের বারুইপুর অঞ্চলে একাদশ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় রাজ্যজুড়ে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। শনিবার বিকালে বন্ধুর জন্মদিনের উপহার কিনতে বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন ওই শিশু। পরিবারের পক্ষ থেকে রাত সাড়ে আটটায় থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করা হলেও পুলিশ তাতে গুরুত্ব দেয়নি বলে অভিযোগ। পরের দিন সকালে স্থানীয় এক পুকুর থেকে একটি বস্তার ভেতর শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ ডুবে যাওয়া বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর থেকে ধারণা করা হচ্ছে, জীবন্ত অবস্থাতেই তাকে পানিতে ফেলা হয়েছিল।
ঘটনার পর থেকেই বারুইপুর এলাকা অশান্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষুব্ধ জনতা রাস্তাঘাট, দোকানপাট ও একটি স্থানীয় রেলস্টেশন ভাঙচুর করে। এই বিশৃঙ্খলার সময় এক তরুণকে পিটিয়ে হত্যা করে জনতা। মুখ্যমন্ত্রী সুবেন্দু অধিকারী পরে জানান, ওই ব্যক্তি সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিলেন। এদিকে, পুলিশ বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে নামলে বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হন এবং যানবাহনের ক্ষতি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে এলাকায় গণজমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে এই ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে স্থানীয় বাসিন্দা প্রভাশ মণ্ডলকে শনাক্ত করে জনতা। তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মণ্ডল। পুলিশের দাবি, ঘটনার পুনঃতদন্তের জন্য তাকে পুকুরের কাছে নিয়ে যাওয়া হলে তিনি পুলিশের অস্ত্র ছিনিয়ে নিতে চেষ্টা করেন এবং গুলি চালান। পাল্টা গুলিতে তিনি আহত হন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত্যু হয়। তবে এই সংস্করণ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ডটি দ্রুত রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে। বিরোধী দলগুলো রাজ্যের নবনির্বাচিত বিজেপি সরকারের সমালোচনা করে বলছে, নারী নিরাপত্তায় সরকার ব্যর্থ হয়েছে। সম্প্রতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তিন মেয়াদি সরকারের পতনের অন্যতম কারণ ছিল নারী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাও রাজ্যে নারী নিরাপত্তা নিয়ে আগুনে ঘি ঢেলেছে। ঘটনার ধর্মীয় মাত্রাও দেখা দিয়েছে, কারণ ভুক্তভোগী মুসলিম এবং গ্রেপ্তারকৃতরা হিন্দু। স্থানীয় বিজেপি নেতা সুশান্ত মণ্ডলের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে বিক্ষোভকারীরা। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি আসলে অপরাধীদের ধরতে সহায়তা করেছিলেন।
মুখ্যমন্ত্রী সুবেন্দু অধিকারী মঙ্গলবার ওই শিশুর পরিবারের সঙ্গে দেখা করে ন্যায়বিচারের আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, "আমাদের সরকার রাজ্যে এ ধরনের ঘটনা রোধ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পুলিশ যা করার করছে। পরিবার তাদের মেয়েকে হারিয়েছে, আমি বিশ্বাস করি তাদের সঙ্গে কথা বলে তারা সন্তুষ্ট হয়েছে।" তবে ওই সফরের ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে পুলিশি গুলিতে প্রভাশ মণ্ডলের মৃত্যু ঘটে।
প্রভাশ মণ্ডলের মা সংবাদ সংস্থা এএনআইকে বলেন, "দুই পুলিশ কর্মকর্তা এসে জানালেন আমার ছেলে মারা গেছে। আমি বললাম, আমার কোনো আপত্তি নেই। আমার ছেলে যা করেছে তার শাস্তি পেয়েছে। আমি তার মৃতদেহ গ্রহণ করব না, বাড়িতেও আনব না।" অন্যদিকে, গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সংস্থার রঞ্জিত সুর ঘটনাটিকে 'সন্দেহজনক' বলে আখ্যায়িত করেন। তাঁর মতে, দেশের অনেক রাজ্যে পুলিশি এনকাউন্টারের গল্প প্রায় একই—পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা এবং তারপর পাল্টা গুলিতে মৃত্যু। ২০১৯ সালে হায়দরাবাদে এক তরুণীকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে চার আসামিকে পুলিশি এনকাউন্টারে হত্যার ঘটনার সঙ্গে এই ঘটনার মিল খুঁজে পাচ্ছেন বিশ্লেষকরা।
এখন পর্যন্ত পুলিশ তিনটি মামলা নথিভুক্ত করেছে এবং ৪০ জনকে আটক করেছে। শিশু নির্যাতন বিরোধী কঠোর আইন পকসোর অধীনে মামলা সংশোধন করা হয়েছে। ঘটনার তদন্তে একটি বিশেষ তদন্ত দল (এসআইটি) গঠন করা হয়েছে। তবে পুলিশ এখনো সংবাদ সম্মেলন করে এই মামলা নিয়ে কোনো বক্তব্য দেয়নি বা অভিযোগের জবাব দেয়নি।




