ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অ্যাকশন ধারার যে পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত, সেই প্রয়াত নায়ক জসীমের জন্মদিন আজ। সত্তরের দশকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ফাইটিং গ্রুপের সূচনা তাঁর হাত ধরেই। বর্তমান প্রজন্মের অনেক ফাইট ডিরেক্টর ও স্টান্টম্যান ছিলেন তাঁর সরাসরি ছাত্র, যাঁরা এখনো গর্বের সঙ্গে বলেন, ‘আমরা জসীম সাহেবের হাতে ফাইট শিখেছি।’

খলনায়ক হিসেবে পর্দায় যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তীকালে নায়ক হিসেবে দর্শকহৃদয়ে নিজের আসন পাকাপোক্ত করেছিলেন জসীম। ১৯৯৮ সালের ৮ অক্টোবর মাত্র ৪৮ বছর বয়সে চলে যান তিনি। সাধারণ মানুষের প্রিয় এই নায়ক একাধারে ধুন্ধুমার অ্যাকশন দৃশ্যে হাততালি কুড়াতেন, আবার নায়ক হিসেবে দর্শকদের আবেগের স্পর্শও পেতেন। তাঁর নীরব অশ্রুবিয়োগের অভিনয় আজও ঢাকাই ছবির দর্শকদের মনে গেঁথে আছে।

ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার বক্সনগর গ্রামে ১৯৫০ সালের ১৪ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন আবদুল খায়ের জসীম উদ্দিন। ছোটবেলা থেকেই ছিলেন সাহসী। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ২ নম্বর সেক্টরে অংশ নেন। যুদ্ধফেরত এই তরুণই পরবর্তীকালে ঢাকাই সিনেমায় বীরত্ব ও অ্যাকশনের নতুন ধারা তৈরি করেন।

১৯৭২ সালে ‘দেবর’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক। তবে ১৯৭৩ সালে প্রয়াত জহিরুল হকের ‘রংবাজ’ ছবিতে খলনায়ক চরিত্রে অভিনয় করে সবার নজরে আসেন। এই ছবির অ্যাকশন দৃশ্যগুলো পরিচালনা করেছিল তাঁর নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা জ্যাম্বস ফাইটিং গ্রুপ। এরপর দেওয়ান নজরুল পরিচালিত হিন্দি ‘শোলে’ ছবির রিমেক ‘দোস্ত দুশমন’-এ গব্বর সিংয়ের চরিত্রে এমন বাস্তবসম্মত অভিনয় করেন যে, দর্শকরা সিনেমা হলে ঢোকার সময় বলতেন, ‘আজ জসীমের মাইর খেতে যাচ্ছি।’

খলনায়ক থেকে নায়ক হয়ে ওঠার গল্পটি যেন দুই অধ্যায়ের। সুভাষ দত্তের ‘সবুজ সাথী’ ছবিতে প্রথম নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন। এই ছবির সাফল্যের পর তিনি আর কখনো খলনায়কের ভূমিকায় ফিরে যাননি। পর্দায় শোষিত, নিপীড়িত, বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন তিনি। আশির দশকে তিনি ছিলেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় অ্যাকশন হিরো।

শাবানার সঙ্গে জসীমের জুটি ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। আশ্চর্যের বিষয়, তিনি শাবানার বিপরীতে প্রেমিক ও ভাই—দুই চরিত্রেই অভিনয় করেছেন এবং দুটিতেই সমান সাফল্য পেয়েছেন। ‘ভাইবোন’, ‘মেয়েরাও মানুষ’, ‘পরিবার’, ‘বুকের ধন’—এসব ছবিতে তিনি ছিলেন পারিবারিক নায়ক; আবার ‘লালু মাস্তান’, ‘বারুদ’, ‘নবাবজাদা’য় ছিলেন অ্যাকশন হিরো। রোজিনার সাথেও তাঁর জুটি দর্শকদের মনে দাগ কেটেছে। আশির দশকে শাবানা ও রোজিনার বিপরীতে তাঁর অধিকাংশ ছবিই ছিল ব্যবসাসফল।

জসীমের প্রায় দুই শতাধিক ছবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘তুফান’, ‘জবাব’, ‘নাগ-নাগিনী’, ‘বদলা’, ‘বারুদ’, ‘সুন্দরী’, ‘কসাই’, ‘লালু মাস্তান’, ‘নবাবজাদা’, ‘অভিযান’, ‘কালিয়া’, ‘বাংলার নায়ক’, ‘গরিবের ওস্তাদ’, ‘রাজা বাবু’, ‘স্বামী কেন আসামী’, ‘মেয়েরাও মানুষ’, ‘বুকের ধন’ প্রভৃতি। অধিকাংশ ছবিতেই ছিল সামাজিক বার্তা, দরিদ্রের সংগ্রাম, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই, মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, প্রেমে ত্যাগ—যা তাঁকে পর্দার নায়ক থেকে বাস্তব জীবনের প্রতীকে পরিণত করেছিল।

শুধু পর্দায় নয়, বাস্তব জীবনেও ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা। শুটিংয়ের ফাঁকে তরুণ সহকর্মীদের বলতেন, ‘দেশের জন্য গুলি খেয়েছি, এখন দর্শকের ভালোবাসার জন্য মার খাচ্ছি।’ তাঁর জীবনের এই বাস্তব বীরত্বই তাঁকে সিনেমায় এতটা বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখনো জনপ্রিয় জসীম। ইউটিউব শর্টস বা ফেসবুক রিলসে তাঁর অভিনয়, নাচ, মারপিটের দৃশ্য খোঁজেন দর্শক। তরুণেরা তাঁর সংলাপ অনুকরণ করেন, তাঁর ছবি নিয়ে মিম তৈরি হয়। সম্প্রতি এআইয়ে তৈরি জসীমের ছবি দেখে তাঁর ছেলের প্রতিক্রিয়াও ভাইরাল হয়েছে, যা প্রমাণ করে তিনি আজও দর্শকদের মনে বেঁচে আছেন।