মানবাধিকার সুরক্ষা ও গুম প্রতিরোধে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে সরকার। আজ মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেন, সরকার আরও ভালো আইনের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে উল্টো পথে হাঁটছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি এ বৈঠকের আয়োজন করে।
বৈঠকে বক্তারা বলেন, খসড়া আইনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা সংকুচিত করা হয়েছে। পাশাপাশি, গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ন্যস্ত করার প্রস্তাব থাকায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হবে প্রশ্নবিদ্ধ। এর ফলে দায়মুক্তির পুরোনো সংস্কৃতি আবারও মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, সরকার আগের মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধের অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন আইন আনার কথা বললেও খসড়ায় কমিশনের স্বাধীন তদন্ত ক্ষমতা সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, যেসব বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠতে পারে, তাদের হাতেই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব অযৌক্তিক। মিথ্যা অভিযোগের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের শাস্তির বিধান ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ওপর ভীতি সৃষ্টি করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আলোকচিত্রী, লেখক ও মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলম মনে করেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর একটি ভিন্ন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল এবং নতুন সরকারকে সেটি প্রমাণ করতে হবে। মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন তদন্ত ক্ষমতা এবং কমিশনার নিয়োগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে তিনি অভিমত দেন। নিরাপত্তা বাহিনীর প্রভাবমুক্ত রাষ্ট্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ বন্ধ করে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর পুরোনো সংস্কৃতি বদলানো প্রয়োজন, শুধু দল বা নেতৃত্ব পরিবর্তন করলে হবে না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে এবং পুলিশ কমিশনসহ প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন জরুরি।
এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির উপপ্রধান সারোয়ার তুষার বলেন, গুম হয়েছে কি না তা নির্ধারণের দায়িত্ব পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে দেওয়া মোটেও ঠিক নয়। কারণ অভিযোগের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার প্রশ্ন থেকেই যায়। মিথ্যা অভিযোগের জন্য পাঁচ বছরের শাস্তির বিধানও ভুক্তভোগী পরিবারকে চাপে ফেলবে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ তৈরি করবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর মানবাধিকার কমিশনের সদস্য বাছাইয়ে সরকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রাধান্য থাকলে কমিশনের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগের দাবি জানান। আইন পাসের আগে নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের মতামত নিয়ে চাপ তৈরি করাও প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
মানবাধিকারকর্মী রুবি আমাতুল্লাহ বলেন, মানবাধিকার নিশ্চিত না হলে ন্যায়বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। জুলাইয়ের পরিবর্তনের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। শুধু আইন প্রণয়ন করেই নয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং জনগণকে সচেতন ও সোচ্চার রাখতে হবে।
বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুমসংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির সাবেক সদস্য নাবিলা ইদ্রিস। তিনি বলেন, নতুন আইনি কাঠামোয় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্তের সুযোগ কমানো হচ্ছে। তদন্তের স্বাধীনতা খর্ব না করে সংবেদনশীল অভিযানের জন্য আলাদা নিরাপত্তা ও আইনি ব্যবস্থা করা উচিত বলে তিনি মত দেন।
এনসিপির কেন্দ্রীয় সংগঠক আরমান হুসাইনের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য তানিম হোসেন শাওন এবং সাবেক সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য শরীফ ভূঁইয়া। সবাই মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ আইনে স্বাধীন তদন্ত, জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।




