বাংলাদেশের চকলেট বাজার বর্তমানে তিন হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর এই খাতটি ১২ থেকে ১৫ শতাংশ হারে সম্প্রসারিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান মর্ডর ইন্টেলিজেন্সের ২০২৬ সালের জানুয়ারির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের সামগ্রিক ক্যান্ডি ও কনফেকশনারি বাজারের মূল্য প্রায় ৯৮৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার সমতুল্য। ২০৩১ সালের মধ্যে এই বাজার ১.২৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে।
এক সময় বিদেশি ব্র্যান্ডের একচেটিয়া আধিপত্য থাকলেও বর্তমানে চকলেট বাজারের প্রায় ৭৫ শতাংশই দেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণে। এই খাতে শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান প্রাণ কনফেকশনারি একাই বাজারের ৪০ শতাংশ দখল করে আছে। নরসিংদীর পলাশে অবস্থিত প্রাণ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে উৎপাদিত চকলেট দেশের সর্বত্র পৌঁছে যাচ্ছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ চুইংগাম, চকলেট বার, চকলেট বিন, লিকুইড চকলেট, ললিপপসহ নানা বৈচিত্র্যময় পণ্য বাজারে ছাড়ছে।
প্রাণের পাশাপাশি অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, আকিজ বেকার্স, পারটেক্স স্টার গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, আবুল খায়ের গ্রুপ, এসিআই ফুডস, কোকোলা ফুডস ও ইফাদ কনফেকশনারিও এই খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২১ সালে প্রায় ১২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে আকিজ ইনসাফ গ্রুপের 'আকিজ বেকার্স লিমিটেড' বেকারি ও কনফেকশনারি খাতে যাত্রা শুরু করে। ২০২৫ সালের শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক মানের প্রিমিয়াম চকলেট ব্র্যান্ড 'হাই-ফাইভ' বাজারে নিয়ে আসে।
আকিজ বেকার্স লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম তুষার বলেন, দেশের ভোক্তারা এখন প্রিমিয়াম মানের চকলেট খুঁজছেন, যা সরবরাহ করতে তারা বিশ্বমানের পণ্য বাজারে ছাড়ছেন। তবে কোকোসহ প্রধান কাঁচামাল আমদানিনির্ভর হওয়ায় ডলারের উচ্চ হার ও বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন খরচে চাপ সৃষ্টি করছে। তিনি সরকারের নীতিগত সহায়তা কামনা করেন যাতে এই খাত ভবিষ্যতে বড় রপ্তানিশিল্পে পরিণত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান দ্য অবজারভেটরি অব ইকোনমিক কমপ্লেক্সিটির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বার্ষিক প্রায় ৪.০৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের চকলেট ও কোকো প্রস্তুতকৃত খাদ্যসামগ্রী রপ্তানি করছে। পাশাপাশি, গত তিন-চার বছরে হাতে তৈরি চকলেট বা হ্যান্ডমেড চকলেটের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
চ্যালেঞ্জের দিক থেকে দেখা যায়, চকলেটের প্রধান কাঁচামাল কোকো বিন, কোকো পাউডার ও কোকো বাটার আমদানিনির্ভর। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোকো ও চিনির দামে অস্থিরতা, ডলার সংকট, জাহাজ ভাড়া ও লজিস্টিক খরচ বৃদ্ধি, প্যাকেজিং ও বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় কাঁচামাল আমদানি খরচ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
প্রাণ কনফেকশনারির বিপণন বিভাগের প্রধান সাখাওয়াত আহামেদ সাকি জানান, ভোক্তাদের সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে চলেছে প্রাণ। কাঁচামালের দাম বাড়লেও বাজারের নেতা হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তারা নতুন পণ্য ও প্যাকেজিং উদ্ভাবনের মাধ্যমে দাম নিয়ন্ত্রণ করছে।
সব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশের চকলেট শিল্পের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা। সরকার শুল্ককাঠামো শিথিল করলে এবং রপ্তানি প্রণোদনা দিলে এই খাত দেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী শিল্পে পরিণত হতে পারে।




