আজ ৬ আগস্ট, ১৯৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক জাপানের হিরোশিমা শহরে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের ৮১তম বার্ষিকী। তিন দিন পর একই ঘটনার শিকার হয় নাগাসাকি শহর। ‘লিটল বয়’ এবং ‘ফ্যাট ম্যান’ নামে পরিচিত এই দুটি মারণাস্ত্রের ফলশ্রুতিতে তাৎক্ষণিকভাবে লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারান, এবং তেজস্ক্রিয়তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে মানব ইতিহাসের ভয়ংকরতম ট্র্যাজেডির সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটলেও এই হামলার মূল লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, যা চরম প্রাণ সংহারের স্মারক হিসেবে বিবেচিত।
যুদ্ধের প্রেক্ষাপট: ১৯৪৫ সালের আগস্ট নাগাদ ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে গেলেও জাপান আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ চলতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের ওপর নিজের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং জাপানের ১৯৪১ সালে পার্ল হারবার হামলার প্রতিশোধ নেওয়ার মানসিকতা নিয়ে কাজ করছিল। ১৯৪৫ সালের ৮ মে জার্মানির আত্মসমর্পণের পর পটসডাম সম্মেলনে জাপানকে বিনা শর্তে আত্মসমর্পণের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়, যা জাপান প্রত্যাখ্যান করে। তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান নজিরবিহীন এক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
ম্যানহাটন প্রজেক্ট ও বোমা তৈরির ইতিহাস: ১৯৩৮ সালে জার্মানিতে পারমাণবিক ফিশন আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানীদের মধ্যে আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়ে যে নাৎসি জার্মানি পারমাণবিক বোমা তৈরি করে ফেলতে পারে। এই ভয় থেকে ১৯৩৯ সালে আইনস্টাইন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে চিঠি লেখেন, যার ফলশ্রুতিতে ‘ম্যানহাটন প্রজেক্ট’-এর সূচনা হয়। নিউ মেক্সিকোর লস আলামোসে গোপন গবেষণাগার স্থাপিত হয়, যার সামরিক প্রধান ছিলেন জেনারেল লেসলি গ্রোভস এবং বৈজ্ঞানিক পরিচালক ছিলেন জে রবার্ট ওপেনহেইমার। তবে জার্মানির আত্মসমর্পণের পর দেখা যায় যে তাদের পারমাণবিক বোমা তৈরির কোনো প্রমাণ নেই। তবুও প্রকল্প বন্ধ না হওয়ার কারণ ছিল—মার্কিন সামরিক প্রশাসন ও রাজনীতিবিদেরা বুঝতে পেরেছিলেন যে এই অস্ত্র যুদ্ধোত্তর বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হতে পারে।
ট্রিনিটি পরীক্ষা: ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই নিউ মেক্সিকোর আলামোগর্ডো মরুভূমিতে ‘ট্রিনিটি’ নামক পৃথিবীর প্রথম পারমাণবিক বোমা পরীক্ষা চালানো হয়। বিস্ফোরণের তীব্রতা ছিল প্রায় ২১ কিলোটন টিএনটির সমান। পরীক্ষার টাওয়ার এবং আশপাশের যন্ত্রপাতি বাষ্পীভূত হয়ে যায়। আকাশে বিশাল মাশরুম ক্লাউড তৈরি হয়। ওপেনহেইমার পরে বলেছিলেন, ‘এখন আমিই মহাকাল, বিশ্বের ধ্বংসকর্তা’—ভগবদ্গীতার একটি শ্লোক তাঁর মনে পড়েছিল।
হিরোশিমা বোমা হামলা: ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে মার্কিন বি-২৯ বোমারু বিমান ‘এনোলা গে’ থেকে ‘লিটল বয়’ বোমাটি হিরোশিমার আকাশে ১ হাজার ৮০০ ফুট উচ্চতায় বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণের কেন্দ্রে তাপমাত্রা পৌঁছায় প্রায় ৪ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে। প্রায় সাড়ে ১২ কিলোটন টিএনটির সমপরিমাণ ধ্বংসক্ষমতা সম্পন্ন এই বোমায় শহরের ১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা ভস্মীভূত হয়। প্রথম কয়েক মিনিটেই ৭০ থেকে ৮০ হাজার মানুষ মারা যান, এবং বছরের শেষ নাগাদ মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ৪০ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
নাগাসাকি বোমা হামলা: ৯ আগস্ট ‘ফ্যাট ম্যান’ বোমাটি নিক্ষেপের লক্ষ্য ছিল কোকুরা শহর, কিন্তু সেখানে ঘন ধোঁয়া থাকায় পাইলট চার্লস সুইনি বিকল্প লক্ষ্য হিসেবে নাগাসাকি বেছে নেন। বেলা ১১টা ২ মিনিটে বোমাটি ফেলা হয়। পাহাড়ে ঘেরা শহরের কারণে ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা কম হলেও মুহূর্তে ৪০ হাজার মানুষ মারা যান। বছরের শেষ নাগাদ মৃত্যুর সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। কোকুরা বেঁচে যাওয়ায় জাপানি ভাষায় ‘কোকুরা নো কোউন’ (কোকুরার সৌভাগ্য) শব্দটি যুক্ত হয়।
কালো বৃষ্টি ও হিবাকুশা: বোমা বিস্ফোরণের পর আকাশ থেকে ‘কালো বৃষ্টি’ নেমে আসে, যাতে মিশে ছিল তেজস্ক্রিয় কণা। তৃষ্ণার্ত মানুষ সেই পানি পান করায় মারাত্মক বিকিরণজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত হন। যারা বেঁচে গিয়েছিলেন, তাদের বলা হয় ‘হিবাকুশা’। তারা শারীরিক ও সামাজিক বৈষম্যের শিকার হন—বিয়ে ও চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। পরবর্তী প্রজন্মেও বিকিরণের প্রভাবে বিকলাঙ্গ সন্তান জন্ম নেওয়ার আশঙ্কা ছিল।
ওপেনহেইমারের অপরাধবোধ: ১৯৪৫ সালের ২৫ অক্টোবর ওপেনহেইমার প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানের সাথে দেখা করেন। তিনি চেয়েছিলেন পারমাণবিক প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে থাকুক। কথোপকথনে তিনি বলেন, ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আমার মনে হচ্ছে আমার হাতে রক্ত লেগে আছে।’ ট্রুম্যান ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে ‘কাঁদুনে বিজ্ঞানী’ বলে অভিহিত করেন এবং আর কখনো তাঁর অফিসে ঢুকতে নিষেধ করেন। এই ঘটনা বিজ্ঞান ও রাজনীতির মধ্যে বিবেকের সংকটকে তুলে ধরে।
পরিণতি ও মূল্যায়ন: জাপানের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলেও ইতিহাসবিদরা মনে করেন যে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার অজুহাতে বোমা ব্যবহারের যুক্তি অসার। জাপানের নৌ ও বিমানবাহিনী ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এবং দেশটি খাদ্যসংকটে ভুগছিল। মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় নিজের সামরিক শক্তি প্রদর্শন করতেই যুক্তরাষ্ট্র এই মারণাস্ত্র প্রয়োগ করেছিল বলে অনেকে মনে করেন। মানব ইতিহাসের এই কলঙ্কিত অধ্যায় রাজনৈতিক স্বার্থে ঘটিত এক নির্মম গণহত্যার দলিল।


