আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্বীকৃত স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবি-র নির্বাহী পরিচালক এবং বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. তাহমিদ আহমেদ সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তাঁর গবেষণাকর্মের বিভিন্ন দিক, বাংলাদেশের জন্য এর তাৎপর্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য তুলে ধরেছেন। এশিয়ান সায়েন্টিস্ট প্রকাশিত এশিয়ার শীর্ষ ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান পাওয়ার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি একে সম্মানের পাশাপাশি বিরাট দায়িত্ব হিসেবে অভিহিত করেন। তাঁর ভাষায়, স্বাস্থ্য, অপুষ্টি ও সংক্রামক ব্যাধির বৈশ্বিক প্রকোপ বিবেচনায় এখনও অনেক কাজ করার বাকি আছে এবং তরুণদের সক্ষমতা উন্নয়নের মাধ্যমে এই ক্ষেত্রে অগ্রগতি সম্ভব।

নিজের মৌলিক গবেষণাকে সহজবোধ্যভাবে উপস্থাপন করতে গিয়ে বিজ্ঞানী তাহমিদ আহমেদ ব্যাখ্যা করেন, তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের মস্তিষ্কে কোষীয় যোগাযোগকারী বৈদ্যুতিক তারসমূহের পরিমাণ হ্রাস পায়, যার ফলস্বরূপ তাদের বৌদ্ধিক পরিণতি বাধাপ্রাপ্ত হয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটি কেবল ব্যক্তিজীবনের সংকট নয়; বরং জাতীয় অর্থনীতি ও সামগ্রিক উন্নয়নের পথে এক বিরাট বাধাস্বরূপ। এই গবেষণার ব্যবহারিক দিক সম্পর্কে তিনি উল্লেখ করেন, এখন প্রয়োজন এমন সহজ চিকিৎসাপদ্ধতি উদ্ভাবন করা, যা বাড়িতে বসেই প্রয়োগ করা সম্ভব, কারণ বিপুল আক্রান্ত জনগোষ্ঠীকে হাসপাতালে আনা বাস্তবসম্মত নয়।

বাংলাদেশের জন্য এই গবেষণার সুফল দ্বি-মাত্রিক বলে মন্তব্য করেছেন ড. তাহমিদ। প্রত্যক্ষভাবে, উদ্ভাবিত নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি অপুষ্টিতে ভোগা শিশু ও গর্ভবতী নারীরা উপকৃত হবে। পরোক্ষ প্রভাব হিসেবে তিনি ওরস্যালাইনের মতো আবিষ্কারের উদাহরণ টেনে বলেন, বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত এই ধরনের মানসম্পন্ন গবেষণা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হচ্ছে এবং উন্নত রাষ্ট্রগুলোও এর ফলাফল নিজস্ব প্রয়োজনে কাজে লাগাচ্ছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনায় ড. তাহমিদ তিনটি প্রধান লক্ষ্যকে সামনে রেখেছেন। প্রথমত, নবীন গবেষকদের পেশাগত দক্ষতা ও সক্ষমতা সর্বোতিক্রমে বৃদ্ধি করা। দ্বিতীয়ত, সম্পদের সদ্ব্যবহার নিশ্চিতে সরকারের নিকটে গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে নীতি নির্ধারণে সহায়তা করা। এবং তৃতীয়ত, তাঁর দীর্ঘ ৪০ বছরের কর্মজীবনের প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবি-র অবকাঠামো আরও সুসংহত ও মজবুত করা, যাতে ভবিষ্যতেও বিশ্বকে অনন্য সব উদ্ভাবন উপহার দেওয়া অব্যাহত রাখা যায়।

তরুণ ও শিক্ষার্থীদের প্রতি পরামর্শ প্রদানে তিনি কয়েকটি অপরিহার্য বিষয়ের কথা বলেছেন। প্রথম কাজ হিসেবে তিনি নিষ্ঠার সাথে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন করার গুরুত্ব আরোপ করেন। পাশাপাশি সমকালীন স্বাস্থ্য ও সামাজিক বিষয়াদি নিয়ে নিরন্তর চিন্তা-ভাবনা ও অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলাকে অপরিহার্য বলে মত দেন। পেশাগত ক্ষেত্রে, উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের আগে কোনো প্রকল্প বা সংস্থায় জয়েন করে হাতেকলমে গবেষণার অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের বিষয়টিকে অত্যন্ত জরুরি বলে আখ্যায়িত করেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘পিএইচডি আরেকটু পরের ব্যাপার, তার আগে অভিজ্ঞতা নেওয়া খুব দরকার।’ সর্বশেষ, বিজ্ঞানচর্চায় ধৈর্যকে অবশ্যম্ভাবী গুণ হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, একজন গবেষককে নিজের জন্য যথেষ্ট সময় বরাদ্দ করার মানসিকতা নিয়ে অগ্রসর হতে হবে।