এপ্রিলে কোয়াচেলায় জাস্টিন বিবারের কনসার্টটি ছিল চার বছরে তার প্রথম। বিশ্বব্যাপী এই কনসার্টের আলোচনা হলেও ভিয়েতনামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি আলোচনা হয়েছে ভিয়েতনামি বংশোদ্ভূত মার্কিন ডিজাইনার হাং লা-এর প্রতিষ্ঠিত লু দান ব্র্যান্ডের ‘পাফা শর্টস’ নিয়ে। এই ঘটনা ইঙ্গিত দেয় যে, রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির দেশটি এখন বৌদ্ধিক সম্পত্তিকে কাজে লাগিয়ে মূল্য শৃঙ্খলে উপরে উঠতে চাইছে।
দেশটির সমৃদ্ধিশালী সাংস্কৃতিক অঙ্গন এখন সরকারের নীতিগত উদ্যোগ ও তরুণ নির্মাতাদের তৃণমূল প্রচেষ্টার মিলনস্থল। ক্রমবর্ধমান ভোক্তা ব্যয় ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেটের সুবিধায় নতুন প্রজন্মের নির্মাতারা এগিয়ে আসছেন। এই প্রতিভা ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর আশা, সংস্কৃতিও রপ্তানিপণ্যে রূপান্তরিত করা সম্ভব হবে।
গত বছর গৃহীত প্রস্তাব ৬৮-এ বেসরকারি খাতকে ভিয়েতনামের ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এটি মহাসচিব তো লামের ‘ডই মোই ২.০’ সংস্কার উদ্যোগের মূল আলোচ্য বিষয়। তবে জানুয়ারিতে পাস হওয়া প্রস্তাব ৮০ সাংস্কৃতিক অর্থনীতির জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এই প্রস্তাবে সংস্কৃতিকে টেকসই উন্নয়নের অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা অর্থনীতি, সমাজ ও পরিবেশের সমান স্তম্ভ।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যান্ড ইকোনমি বিভাগের সিনিয়র ফেলো ও সরকারের উপদেষ্টা ডুক খুওং গুয়েন বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সাংস্কৃতিক শিল্পের ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছে প্রস্তাবটি। ভিয়েতনাম দীর্ঘদিন ধরে দেশের ৫৪টি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্য গড়তে সংস্কৃতিকে ব্যবহার করলেও সংস্কৃতিকে ব্যবসা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া সম্প্রতিকালের ঘটনা বলে মন্তব্য করেন তিনি।
২০৩০ সালের মধ্যে সাংস্কৃতিক অর্থনীতিকে বার্ষিক ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং জিডিপির ৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। গত এক বছরে সংস্কৃতি উদযাপনে নতুন সরকারি ছুটি ঘোষণা, ভেনিস বিয়েনালে প্রথম জাতীয় প্রদর্শনী এবং চীনের সিজিটিএনের আদলে ইংরেজি ভাষার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম ‘ভিয়েতনাম টুডে’ চালু করেছে তো লামের সরকার। ইতালীয় স্থপতি রেঞ্জো পিয়ানো নকশা করা হ্যানয়ের নতুন অপেরা হাউস এবং ২০২৮ সালে সম্পূর্ণ হলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ১৩৫,০০০ আসনের স্টেডিয়াম নির্মাণ শুরু হয়েছে।
ভিয়েতনামের সংস্কৃতির বিকাশ তৃণমূল পর্যায় থেকেও হচ্ছে। ভিয়েতনামি বংশোদ্ভূত মার্কিন সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ভাষ্যকার উইলিয়াম লি অ্যাডামসের মতে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষণার বদলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভিয়েতনামের পপ কালচার বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ বছর আগে মানুষ পশ্চিমা বিশ্বকে অনুকরণ করতে চাইত; এখন তারা নিজেদের জীবনকে প্রতিফলিত করছে। দেশের তরুণ, ডিজিটালি সংযুক্ত জনগোষ্ঠী এই সৃজনশীল ইনকিউবেটর তৈরি করেছে।
২০৩০ সালের মধ্যে ভিয়েতনামের মধ্যবিত্তে আরও ২৩.২ মিলিয়ন মানুষ যুক্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীলগুলোর একটি। কেপিএমজি ভিয়েতনামের পার্টনার ও স্ট্র্যাটেজি গ্রুপ প্রধান লুক ট্রেলোর মনে করেন, এই ক্রমবর্ধমান ভোক্তা শ্রেণি দেশকে ‘ভিয়েতনামে তৈরি করে বিশ্বে রপ্তানি’ থেকে ‘ভিয়েতনামে তৈরি ও বিক্রি’তে রূপান্তরিত করবে।
মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় প্রায় ৪,৫০০ ডলার হওয়ায় দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান বা এমনকি থাইল্যান্ডের মতো এশীয় সাংস্কৃতিক শক্তিধর দেশগুলোর তুলনায় ভিয়েতনাম এখনও তুলনামূলকভাবে দরিদ্র। তবে অ্যাডামস মনে করেন, ডিজিটাল অবকাঠামো ও ‘সাংস্কৃতিকভাবে আত্মবিশ্বাসী’ তরুণ জনগোষ্ঠীর কারণে দেশটি ‘অর্থের প্রয়োজনীয়তা এড়িয়ে যেতে’ পারবে। দক্ষিণ কোরিয়া উচ্চ আয়ের মর্যাদায় পৌঁছানোর পর বৈশ্বিক পপ সাম্রাজ্য গড়েছে, কিন্তু ভিয়েতনাম প্রমাণ করছে উন্নয়ন বক্ররেখার আগেই সংস্কৃতি উৎপাদন ও রপ্তানি শুরু করা সম্ভব।
দেশীয় পপ মিউজিক বা ভি-পপের জনপ্রিয়তা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় Yeah1, DatVietVAC এবং POPS-এর মতো পপ কালচার প্রতিষ্ঠানগুলো প্রবৃদ্ধি পাচ্ছে। ভিয়েতনামের অন্যতম বৃহৎ সমষ্টি ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ৫০০-এর ২৬তম প্রতিষ্ঠান ভিনগ্রুপ গত নভেম্বরে কৌশলের নতুন ‘মূল স্তম্ভ’ হিসেবে সংস্কৃতিকে যুক্ত করেছে। দেশের প্রথম তালিকাভুক্ত মিডিয়া প্রতিষ্ঠান Yeah1 ২০২৫ সালে ৬০ শতাংশ রাজস্ব বৃদ্ধির কথা জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ফ্ল্যাগশিপ রিয়েলিটি শো ‘আঁই ট্রাই ভুওত ন্গান চোং গাই’ (কল মি বাই ফায়ার) প্রতি রাতে ৫০,০০০ দর্শককে আকর্ষণ করে এবং বিশ্বজুড়ে লাখো ভক্ত স্ট্রিমিং করেন। বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির ২০০ মালিকানাধীন চ্যানেলে গত বছর ৮২ বিলিয়ন ভিউ হয়েছে।
Yeah1-এর চেয়ারপারসন থাও লে ফুওং জানান, বছরের শেষে তার বয় ব্যান্ড ‘আপ্রাইজ’কে ভিয়েতনামের বাইরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সনি মিউজিকের সঙ্গে নতুন যৌথ উদ্যোগ SYE হোল্ডিংস আপ্রাইজকে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলতে কাজ করছে। আরেকটি ক্রমবর্ধমান সঙ্গীত ও বিনোদন প্রতিষ্ঠান POPS টোকিও স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। POPS-এর প্রতিষ্ঠাতা এসথার গুয়েন বলেন, শিল্পীদের স্বপ্ন পূরণ করা তাদের দায়িত্ব। শিল্পীদের স্বপ্ন দেশের বাইরে গিয়ে বিশ্বজয় করা। তিনি বলেন, স্থানীয় বাজারে অনুরণন তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ, তবে তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য সবসময় ভিয়েতনামের বাইরে, যুক্তরাষ্ট্রে সফল হওয়া।




