যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে বাংলাদেশি শিক্ষক আবু হানিফ জুয়েলের প্রতিষ্ঠিত সানারিজ টিউটোরিয়াল সেন্টারের ১৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান শিক্ষার্থীদের সাফল্য উদযাপনের এক বড় উৎসবে পরিণত হয়। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার এ আয়োজনে একাডেমিক মেধা, নেতৃত্ব, উন্নতি ও বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের ১০৪ জন শিক্ষার্থীকে নানা ক্যাটাগরিতে অ্যাওয়ার্ড ও সম্মাননা প্রদান করা হয়। এলিমেন্টারি স্কুল থেকে শুরু করে টুয়েলভ গ্রেডের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি হার্ভার্ড, কলাম্বিয়া, ইউসিএলএসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া প্রাক্তন শিক্ষার্থীদেরও অভিনন্দন জানানো হয়। এতে করে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সাফল্য ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
অনুষ্ঠানে মোস্ট ইন্সপায়ারিং/ইনফ্লুয়েনশিয়াল স্টুডেন্ট অ্যাওয়ার্ড পান তাজ খান (জিম), লিডার অ্যাওয়ার্ড পান মেহরান আলম, লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড পান গ্রিসেলদা ভাসকেজ, আইভি/এলিট স্কুলস অ্যাডমিটস অ্যাওয়ার্ড পান তানভির, বেস্ট মেমোর অ্যাওয়ার্ড পান শেখ জিবরান (জিবু), টপ স্কলার অ্যাওয়ার্ড পান ড. সুলিন চৌধুরী, মোস্ট ইমপ্রুভড স্টুডেন্ট অব অল টাইম অ্যাওয়ার্ড পান সাকিবা, মোস্ট লাইকলি টু সাকসিড—ক্লাস অব ২০২৬ অ্যাওয়ার্ড পান আনিয়া এবং ম্যাথ মাস্টারি অ্যাওয়ার্ড পান আইমান। এসব বিশেষ ক্যাটাগরির বাইরে এলিমেন্টারি থেকে টুয়েলভ গ্রেডের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থীদেরও স্বীকৃতি দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা যখন একের পর এক মঞ্চে উঠে মেডেল ও পুরস্কার গ্রহণ করছিল, তখন মিলনায়তনজুড়ে অভিভাবকদের করতালি ও উচ্ছ্বাস লক্ষ করা যায়। অনেক মা-বাবা সন্তানের সাফল্যের মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দী করতে ব্যস্ত ছিলেন।
২০১১ সালে প্রয়াত সেলিম চৌধুরীর সহযোগিতায় লস অ্যাঞ্জেলেসের লিটল বাংলাদেশ এলাকায় সেফালন টিউটোরিয়াল সেন্টার নামে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু। ২০১৩ সালে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় সানারিজ টিউটোরিয়াল সেন্টার। গত দেড় দশকে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেছেন, যাদের প্রায় ৬০ শতাংশ বাংলাদেশি। তবে শুধু বাংলাদেশি কমিউনিটিই নয়—কোরিয়ান, চীনা, ফিলিপিনো, ভারতীয়, পাকিস্তানি, ইথিওপীয়, মঙ্গোলীয়, লাতিনোসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরাও এখানে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ লাভ করেছে।
১৫ বছর পূর্তির এ আয়োজনে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয় প্রয়াত সেলিম চৌধুরীকে। প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে তাঁর সহযোগিতার কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সেলিম চৌধুরীর স্ত্রী সালমা চৌধুরী, যাঁকেও ধন্যবাদ জানানো হয়। সার্বিক সহযোগিতার জন্য টিপু আলম ও জেবুন আলমের পরিবারকেও কৃতজ্ঞতা জানান প্রতিষ্ঠাতা আবু হানিফ জুয়েল।
শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরও সম্মাননা দেওয়া হয়। লস অ্যাঞ্জেলেসপ্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্যতম বড় সাংস্কৃতিক আয়োজন ‘আনন্দ মেলা’র উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা খান মোহাম্মদ আলীকে কমিউনিটি লিডারশিপ অনার অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। বাংলাদেশি সংস্কৃতি ও কমিউনিটিকে একত্রিত করার ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘদিনের ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে এ সম্মাননা দেওয়া হয়। পুরস্কার গ্রহণের পর খান মোহাম্মদ আলী বাংলাদেশিদের পরিচালিত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে স্বীকৃতি পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং সানারিজ টিউটোরিয়াল সেন্টার ও আবু হানিফ জুয়েলকে ধন্যবাদ জানান।
অনুষ্ঠানে সমাজসেবী নাসির খান শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করতে ‘নাসির খান স্কলারশিপ’ চালুর প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। মেধাবী ও উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পথচলায় সহযোগিতা করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য বলে উল্লেখ করা হয়। আয়োজকেরা মনে করেন, শিক্ষার্থীদের সামনে উচ্চশিক্ষার নতুন সুযোগ তৈরি এবং বড় স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
শুধু অ্যাওয়ার্ড বিতরণেই সীমাবদ্ধ ছিল না আয়োজনটি। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল প্রতিভা তুলে ধরতে গান, নৃত্য ও ট্যালেন্ট শোর আয়োজন করা হয়। শিশুদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে নৃত্য থেকে শুরু করে আধুনিক পরিবেশনা—মঞ্চে ছিল নানা রঙের বৈচিত্র্য। দীর্ঘ অনুষ্ঠানজুড়ে একের পর এক পরিবেশনা দর্শকদের মনোরঞ্জন করে। মাইকেল জ্যাকসনের গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশনার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক পর্বের সমাপ্তি ঘটে।
বাংলাদেশি পরিবারগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারের উপস্থিতিতে পুরো অনুষ্ঠানটি পরিণত হয় এক বহুজাতিক মিলনমেলায়। সন্তানের হাতে পুরস্কার ওঠার মুহূর্তে অভিভাবকদের চোখে ছিল গর্ব। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, সাবেক শিক্ষার্থী ও কমিউনিটির মানুষের অংশগ্রহণে আয়োজনটি আনন্দঘন হয়ে ওঠে। শেষদিকে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অতিথিরা মঞ্চে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন—যেন ১৫ বছরের পথচলার অর্জনের প্রতীক হয়ে থাকে সেই ছবি।




