হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণ দিবস আজ, ১৯ জুলাই। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ২০১২ সালে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি। বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তবে সবার অজানা নয় যে, এই কিংবদন্তি লেখক শুরুতে হতে চেয়েছিলেন কবি। কেন তিনি কবিতা লেখা ছেড়ে গদ্যের পথ বেছে নিলেন, তার নেপথ্যে রয়েছে এক মর্মস্পর্শী ঘটনা।

ছোট বেলা থেকেই কবিতার প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্কুল ম্যাগাজিনে ইংরেজি কবিতা ছাপা হয়েছিল তাঁর। পরবর্তীতে নিজের বোনের নাম ব্যবহার করে ‘দৈনিক পাকিস্তান’-এ একটি কবিতা পাঠালে তা প্রকাশিত হয়। ‘দিতে পারো একশ ফানুস এনে/ আজন্ম সলজ্জ সাধ একদিন আকাশে কিছু ফানুস উড়াই’—এই পঙক্তি লিখে উৎসাহিত হলেও কবি হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হচ্ছিল না। ইংরেজি শিক্ষকের অনুপ্রেরণা ও সমারসেট মমের ‘সাহিত্যের মুকুট কবিতা’ উক্তিতে তিনি উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন।

কিন্তু বাংলা একাডেমির একটি ঘটনা তাঁর পথ পুরোপুরি বদলে দেয়। একাডেমি থেকে গল্প, প্রবন্ধ ও কবিতার তিনটি আলাদা সংকলন প্রকাশের পরিকল্পনা হয়। কবিতা সংকলনের দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক হুমায়ূন কবির। এক রাতে তিনটি কবিতা লিখে হুমায়ূন আহমেদ তাঁর কাছে হাজির হন। প্রথম প্রশ্নেই হুমায়ূন কবির জানতে চান, ‘আপনার কবিতা কোথাও ছাপা হয়েছে?’ জবাব ছিল ‘না’। ছন্দ সম্পর্কে জ্ঞান ও কবিতা পড়ার বিষয়ে প্রশ্নের উত্তরেও একই ‘না’। পরপর তিনটি ‘না’-শুনে হুমায়ূন কবির একটি ছোট বক্তৃতা দেন। হুমায়ূন আহমেদ নিজেই লিখেছেন, বক্তৃতা শুনে মনে কষ্ট পেলেও প্রতিটি কথাই সত্যি মনে হয়েছে। সেদিন বাংলা একাডেমি থেকে ফিরে তিনি কবিতা তিনটি ছিঁড়ে ফেলেন। কেমিস্ট্রির বই খুলে পণ করেন, পড়াশোনায় মন দেবেন, ভালো ফল করবেন ও সংসারের হাল ধরবেন। দরিদ্র পরিবারের ছেলের জন্য ‘মহান কাব্যরোগ’ মানায় না বলে সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

সেই থেকে কবিতা লেখা পুরোপুরি ছেড়ে দেন হুমায়ূন আহমেদ। রসায়নে ডক্টরেট শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত বেছে নেন গদ্য লেখাকে। তাঁর উপন্যাস, নাটক ও সিনেমা বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। হিমু, মিসির আলি, শুভ্র, বাকের ভাইয়ের মতো চরিত্র বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছে। তিনি মেঝেতে বসে লিখতেন—এ বিষয়ে ভুল ধারণা থাকলেও নিজেই জানিয়েছেন যে, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে তিনি এ অভ্যাস নেননি। প্রথম জীবনে চেয়ার-টেবিলে বসে লিখলেও পরে মেঝেতেই লেখা শুরু করেন।

হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এই যে, তিনি বইবিমুখ মানুষকেও বইমুখী করেছেন। সহজ ভাষায় গভীর কথা বলার ক্ষমতা ছিল তাঁর। মধ্যবিত্ত জীবনের আবেগ-অনুভূতি ফুটিয়ে তুলতে পেরেছিলেন অসাধারণ দক্ষতায়। প্রয়াণ দিবসে এই কিংবদন্তি লেখককে স্মরণ করছি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়।