ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের কাছে একটি জঙ্গলে সদ্য খোঁড়া অগভীর কবরে পুঁতে রাখা অবস্থায় উদ্ধার হয়েছে আনাস্তাসিয়া বেরেজোভস্কা নামের এক নারীর মরদেহ। ৩৯ বছর বয়সী এই ইউক্রেনীয় নারীকে গত ৩ জুলাই গ্রামের বাড়ি থেকে ডেকে নেওয়ার পর সহযোগীরা একটি কালো বিএমডব্লিউ গাড়িতে তুলে নিয়ে যান বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন। কিয়েভের পাশের ইউরিভ গ্রামের নিকটবর্তী বনে তাঁর মাথায় একাধিক গুলি করে হত্যা করা হয়। তিন দিন পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মরদেহটি উদ্ধার করে।

এই হত্যাকাণ্ডের কয়েক সপ্তাহ আগে, গত ২৯ জুন ইউরোপের ধনী নগররাষ্ট্র মোনাকোর একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের সামনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। ইউক্রেনের অন্যতম ধনকুবের ভাদিম ইয়ারমোলিয়েভ নিজের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে বোমার আঘাতে গুরুতর আহত হন। তাঁর সঙ্গী ও ১৩ বছর বয়সী ছেলেও এ ঘটনায় আঘাতপ্রাপ্ত হন। বিস্ফোরণের বিকট শব্দে ভবনের জানালা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিস্ফোরণস্থলের আশপাশে পুলিশি পাহারা জোরদার করা হয়।

প্রাথমিকভাবে সন্দেহভাজন হিসেবে কালো বাকেট হ্যাট পরা এক পুরুষের কথা বলা হলেও, দিন তিনেক পর মোনাকো ও একাধিক দেশের কর্তৃপক্ষ জানায়, হামলাকারীর নাম আনাস্তাসিয়া বেরেজোভস্কা। তাঁর হাতে একটি বড় সাপের ট্যাটু ছিল। এর আগে কোনো অপরাধের রেকর্ড ছিল না তাঁর, এমনকি ভাদিমের সঙ্গেও তাঁর পূর্ব পরিচয় ছিল না। তাই হঠাৎ এই হামলার পেছনের কারণ স্পষ্ট ছিল না।

জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টের কাছে হফহেইমে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করতেন আনাস্তাসিয়া। প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে, দ্বিতীয় স্বামীর (যিনি তাঁর চেয়ে ৩০ বছরের বড়) সঙ্গেও আলাদা থাকতেন তিনি। সঙ্গী ছিল মাত্র সাত বছর বয়সী একটি ছেলে। আদালতের নথি থেকে জানা যায়, ২০২২ সালে জার্মানিতে পাড়ি জমানোর সময় দ্বিতীয় স্বামীর বিরুদ্ধে ভরণপোষণ না দেওয়ার অভিযোগে মামলা করেছিলেন তিনি। ধারণা করা হয়, তিনি আর্থিক সংকটে ভুগছিলেন। কয়েক বছর আগে ইউক্রেনে মদ্যপ অবস্থায় মারামারিতে জড়ালেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি।

তদন্তে জানা গেছে, আনাস্তাসিয়া অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে হামলার পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়েছিলেন। গত ২৬ জুন ছিল তাঁর ৩৯তম জন্মদিন। ওই দিন থেকে ২৯ জুনের মধ্যে তিনি কয়েকবার ভাদিমের বাসার সামনে গিয়েছিলেন। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নজরদারির সময় তিনি কালো চুল ঢেকে রেখেছিলেন বাকেট হ্যাটে, পরনে ছিল ঢিলেঢালা হুডি ও প্যান্ট। একবার স্বাভাবিক পোশাকে দেখা গেলে তাঁর মুখ ও হাতে থাকা ট্যাটু স্পষ্ট হয়, যা শনাক্তকরণে সহায়তা করে। কর্তৃপক্ষের দাবি, হামলার সম্ভাব্য স্থানগুলো তিনি ঘুরে দেখেছিলেন এবং ছেলেকে ইউক্রেনে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন কয়েক সপ্তাহ আগে।

মোনাকোর কৌঁসুলিদের ভাষ্য, বিস্ফোরণের আগে ভাদিম ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা কাছের একটি রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খেতে গিয়েছিলেন। ওই সময় একটি বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করেন আনাস্তাসিয়া। পরে তিনি কালো পোশাক ও বড় ব্যাগ নিয়ে ভাদিমের বাসার দরজার সামনে ব্যাগটি রেখে চলে যান। মাত্র ২০ সেকেন্ড পর, ভাদিম ও তাঁর পরিবার সড়কের বাঁক ঘুরে ফিরলে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। সন্দেহভাজন ব্যক্তি তৎক্ষণাৎ সড়কের অপর পাশে লুকিয়ে রাখা একটি ক্যামেরা তুলে নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যান। ইউক্রেনের প্রসিকিউটর জেনারেলের প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি হাঁটতে হাঁটতে পকেট থেকে মুঠোফোন বের করেন।

বিস্ফোরণের পর আনাস্তাসিয়া মোনাকো ছেড়ে প্রথমে ফ্রান্সে প্রবেশ করেন। এরপর ভাড়া করা গাড়িতে চেপে ইতালি ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ পেরিয়ে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে পৌঁছান, যেখানে গাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হয়। পরে পোল্যান্ড হয়ে বাসে করে ইউক্রেনে প্রবেশ করেন। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জুলাই তিনি ইউক্রেনে ঢোকেন। পরদিন মোনাকো কর্তৃপক্ষ তাঁকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করে এবং তাঁর বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা দায়ের করে। আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি ও ইন্টারপোলকে বিষয়টি জানানো হয়।

ইউক্রেনে প্রবেশের পর আনাস্তাসিয়া সোজা নিজের গ্রাম হোরোদিশচে যান। ৩ জুলাই সকালে তিনি তাঁর মাকে নিকটবর্তী একটি গ্যাসস্টেশনে নিয়ে যেতে বলেন এবং সেখান থেকে একটি ট্যাক্সি ডেকে নেন। ট্যাক্সিচালককে কিয়েভের দিকে মহাসড়কের একটি জিপিএস অবস্থান দেখান, যা তাঁর সহযোগীরা দিয়েছিল বলে কৌঁসুলিরা দাবি করেন। গন্তব্যে পৌঁছে একটি কালো বিএমডব্লিউ গাড়ি তাঁকে তুলে নেয়। গাড়িতে ছিলেন ভ্লাদিস্লাভ রেউত ও ভিতালি ঝিকোভিচ নামের দুজন। ইউরিভ গ্রামের কাছে একটি জঙ্গলে গাড়ি থামানো হয়। সেখানে আনাস্তাসিয়ার মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয় এবং কোদাল দিয়ে গর্ত খুঁড়ে মরদেহ পুঁতে ফেলা হয়। বন্দুক ও তাঁর ব্যক্তিগত জিনিসপত্র—দুটি মুঠোফোন, একটি লাইটার ও একটি ঘড়ি—কাছের একটি হ্রদে ফেলা হয়। সঙ্গে থাকা অর্থ ও নথিপত্র পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

গ্রামের এক প্রান্তে বিস্তীর্ণ মাঠের পাশে আনাস্তাসিয়ার বাড়ি। সম্প্রতি সেখানে গিয়ে দেখা যায়, উঠানে কাপড় শুকাচ্ছে, বাগানে বাচ্চাদের সাইকেল পড়ে আছে। তাঁর মা ও ছেলে সেখানে থাকলেও দরজা খোলেননি। প্রতিবেশীরা সিএনএনকে বলেন, হামলার খবর শুনে তাঁরা হতবাক। আনাস্তাসিয়ার চেয়ে মাত্র তিন বছরের বড় ভিতালি নামে এক প্রতিবেশী বলেন, ‘মানুষ তাঁর সম্পর্কে ভালো কথাই বলত। মোনাকোয় কী ঘটেছে, তা শুধু তিনি আর ঈশ্বর জানেন। আমার মনে হয়, তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে।’

গ্রেপ্তারের পর রেউত প্রথমে স্বীকার করেন, ঝিকোভিচের নির্দেশেই তিনি আনাস্তাসিয়াকে গুলি করেছিলেন। তবে আদালতে তিনি বলেন, গুলি করেছিলেন ঝিকোভিচ নিজেই। অন্যদিকে ঝিকোভিচের আইনজীবী আনাতোলি ইভানোভ সিএনএনকে বলেন, রেউতই মূল পরিকল্পনাকারী ও হত্যাকারী এবং নিজের দায় এড়াতে ঝিকোভিচের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন। রেউতের পরিচয় নতুন মোড় এনে দেয়: মোনাকোয় হামলার সময় তিনি ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জিইউআরের কর্মরত ছিলেন। তিনি আদালতে বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অজান্তে এতে জড়িয়েছিলেন। জিইউআর কোনো সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে। ঝিকোভিচ আগে ইউক্রেনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে কাজ করেছেন এবং নিরাপত্তা সংস্থার স্বেচ্ছাসেবী কর্মকর্তা হিসেবেও পরিচিত। তদন্তকারীরা তাঁর বাড়ির বেজমেন্টে একটি কক্ষের সন্ধান পেয়েছেন, যা ‘নির্যাতন কক্ষের’ মতো বলে দাবি করা হলেও তাঁর আইনজীবী তা অস্বীকার করেছেন।

ইউক্রেনীয় কৌঁসুলিরা জানান, হামলার কয়েক মাস আগে থেকেই রেউত ও ঝিকোভিচের সঙ্গে আনাস্তাসিয়ার যোগাযোগ ছিল। তাঁরা তাঁকে কয়েক দফায় ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ব্যাংক স্থানান্তরের মাধ্যমে অর্থ দিয়েছিলেন। ঝিকোভিচের আইনজীবীর দাবি, সব মিলিয়ে এ অর্থের পরিমাণ ছিল ছয় থেকে সাত হাজার ইউরো। আইনজীবী আরও বলেন, তাঁর মক্কেল ভেবেছিলেন, তিনি ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থার গোপন মিশনে কাজ করছেন। তবে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা এই দাবি অস্বীকার করেছেন। ইউক্রেনের প্রসিকিউটর জেনারেল বলেন, আনাস্তাসিয়া ভিডিও ধারণ করেছিলেন ‘আদেশ কার্যকর করার প্রমাণ রাখতে’।

হামলার ভুক্তভোগী ভাদিম ইয়ারমোলিয়েভ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সিএনএনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেন, কাউকে সন্দেহ করার কোনো কারণ তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, ‘আমার কখনো কোনো শত্রু ছিল না। আমি ঝগড়াঝাঁটি বা সংঘাতে জড়ানোর মানুষ নই। কেন আমাকে টার্গেট করা হলো, সেটা বুঝতে পারছি না।’ ইউক্রেন রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল—এমন ধারণাও তিনি নাকচ করে দেন। তাঁর মতে, রেউত অর্থের জন্য নিজের মতো করে কাজ করেছেন এবং গোপন অভিযানের দক্ষতার কারণে কেউ ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের নিয়োগ করেছিল। ‘কে এই হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন,’ বলেন ভাদিম।

ভাদিমের বড় ছেলে আর্তুর ইয়ারমোলিয়েভ ইউক্রেনের অপরাধ জগতে পরিচিত ও প্রভাবশালী নাম। বড় প্রতারণা চক্রের মূল হোতা হওয়ার অভিযোগে সাইপ্রাসে গ্রেপ্তার হয়ে এস্তোনিয়ায় প্রত্যর্পিত হন তিনি। গত এপ্রিলে তিনি স্বীকার করেন, নিজের গড়ে তোলা ফোন প্রতারণা চক্রের মাধ্যমে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছ থেকে প্রায় ১০ কোটি ইউরো হাতিয়ে নেওয়া হয়। আদালত তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিলেও একটি সমঝোতার আওতায় মাত্র চার মাস কারাভোগ করে ৮৫ লাখ ইউরো জরিমানা দিয়ে এস্তোনিয়া থেকে বহিষ্কৃত হন। ভাদিম বলেন, দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এড়াতে ছেলে এই সমঝোতায় রাজি হয়েছিলেন এবং তিনি এখনও ছেলেকে নির্দোষ মনে করেন। নিজের সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ছেলের গড়ে তোলা ওই প্রতারণা চক্রের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। কম্পিউটার কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, সেটাও আমি জানি না। শুধু ফোন ব্যবহার করতে পারি।’

ভাদিম আরও বলেন, আনাস্তাসিয়ার কথা ভাবলে তাঁর মনে শূন্যতা তৈরি হয়। ‘তিনি আমাকে প্রায় খুন করে ফেলেছিলেন। আমার সঙ্গীকে গুরুতর আহত করেছেন। তবে এই গল্পের মূল খেলোয়াড় ওই নারী নন। আমার মনে হয়, তিনি একজন বোকাসোকা মানুষ ছিলেন। কোনোভাবে তাঁকে বোঝানো হয়েছিল, তিনি গুরুত্বপূর্ণ ও বড় কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত,’ বলেন তিনি। তাঁর ধারণা, অন্যদের বিরুদ্ধে যাতে সাক্ষ্য দিতে না পারেন—সে কারণেই আনাস্তাসিয়াকে খুন করা হয়েছে। ‘আনাস্তাসিয়া দীর্ঘদিন একা আমার ওপর নজর রেখেছেন এবং পুরো ঘটনাটি একাই পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করেছেন, তা মোটেও বাস্তবসম্মত নয়,’ যোগ করেন ধনকুবের ভাদিম। এভাবে মূল পরিকল্পনাকারীর পরিচয় ও হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য এখনও অজানা রয়ে গেছে।