জহির রায়হানের অমর সৃষ্টি ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসটি চলচ্চিত্রায়িত করেছেন তাঁরই জীবনসঙ্গী কিংবদন্তি অভিনেত্রী সুচন্দা। পরিচালক হিসেবে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, স্রষ্টার রচনার প্রতি গভীর অনুরাগ ও বোধ থাকলে তা যেকোনো মাধ্যমেই জীবন্ত করে তোলা সম্ভব। চলচ্চিত্রটির প্রতিটি ফ্রেমে যেন ধরা পড়েছে উপন্যাসের অক্ষরে অক্ষরে বর্ণিত বাংলার প্রকৃতি ও জনপদের জীবন। পরীর দীঘি গ্রামের পটভূমিতে কাশেম শিকদার থেকে শুরু করে মকবুল শিকদার ও মন্তু-টুনির প্রেমের কাহিনী—সবই অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ছবির শুরুতে ভেলায় ভেসে আসা কাশেম ও ছমিরনের দৃশ্য যেমন চিরায়ত বেহুলা-লখিন্দরের ভেলাযাত্রার স্মৃতি জাগায়, তেমনি গ্রামীণ নারীর ত্যাগ, কষ্ট ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অন্ধকার দিকগুলোও চিত্রিত হয়েছে স্পষ্টভাবে। ছমিরনের আত্মহত্যা থেকে শুরু করে টুনির কিশোরী বিয়ে ও মন্তুর প্রতি তার অপ্রকাশিত ভালোবাসা—প্রতিটি চরিত্রই গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পরিচালক সুচন্দা নিজেও টুনির মা চরিত্রে অভিনয় করে তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে রিয়াজ মন্তু চরিত্রে এবং নবাগতা শারমিন জোহা শশী টুনি চরিত্রে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন। এ টি এম শামসুজ্জামানের মকবুল শিকদার চরিত্রটি চলচ্চিত্রের অন্যতম সম্পদ। সংগীত বিভাগটিও সমানভাবে সমৃদ্ধ। সুবীর নন্দী ও অনুপমা মুক্তির কণ্ঠের গানগুলো দর্শকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। ‘আশা ছিল মনে মনে প্রেম করিমু তোমার সনে’ ও ‘তুমি সুতোয় বেঁধেছ শাপলার ফুল’—এমন গানগুলি জহির রায়হানের নিজের লেখা। সংগীত পরিচালনায় আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল গ্রামীণ সুরের মূর্ছনা ফুটিয়ে তুলেছেন। চিত্রগ্রহণে মাহফুজুর রহমান খান ও সম্পাদনায় মজিবুর রহমান দুলুর কাজ প্রশংসনীয়। গ্রামবাংলার প্রতিটি উপাদান—ধান ভানা, মাছ ধরা, নৌকাভ্রমণ, মেলার দৃশ্য—এতটাই স্বাভাবিকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে দর্শক কখনোই মনে করেন না এটি একটি নির্মিত দৃশ্য। জহির রায়হানের অকালপ্রয়াণের পরও তাঁর সৃজনশীল স্বপ্নসত্তাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন সুচন্দা। তিনি শুধু একজন পরিচালক নন, বরং এক কালজয়ী শিল্পীর উত্তরাধিকার রক্ষাকারী। এই চলচ্চিত্রটি প্রমাণ করে যে, সত্যিকারের শিল্প কখনো মরে না—শুধু মাধ্যম বদলায়।
সুচন্দার নির্মাণ দক্ষতায় ‘হাজার বছর ধরে’ চিরায়ত চলচ্চিত্রের মর্যাদা পেয়েছে
কিংবদন্তি অভিনেত্রী ও পরিচালক সুচন্দা জহির রায়হানের কালজয়ী উপন্যাস ‘হাজার বছর ধরে’ অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রটি দর্শকমহলে প্রশংসিত হয়েছে। গ্রামবাংলার প্রকৃতি, সমাজবাস্তবতা ও নারীর জীবনচিত্র অসামান্য মুনশিয়ায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই ছবিতে।



