বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত রোবোটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে বর্তমানে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৪৫ জন রোগী ফিজিওথেরাপি সেবা নিচ্ছেন। এআই প্রযুক্তিসম্পন্ন এই রোবটগুলো মানবসেবীর বিকল্প হিসেবে কাজ করছে, যেখানে রোগীদের হাত-পা ভাঁজ করা, সোজা করা বা ঘোরানোর মতো কাজগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হয়।

রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত এই কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসা কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা মবিবুর রহমান জানান, ফেব্রুয়ারি মাসে পড়ে গিয়ে তাঁর বাঁ পায়ের লিগামেন্ট গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এপ্রিলে অস্ত্রোপচারের পর পায়ে আগের মতো জোর ফিরে পাচ্ছিলেন না। দুই সপ্তাহ ধরে তিনি এই কেন্দ্রে বিনা মূল্যে ফিজিওথেরাপি নিচ্ছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, পায়ের উন্নতি স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করছেন তিনি।

গত বছরের ৩১ আগস্ট চালু হওয়া এই কেন্দ্রের পিছনে রয়েছে চীন সরকারের সহায়তা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার অংশ হিসেবে চীন ৬২টি রোবট দান করে, যার মধ্যে ২২টি সম্পূর্ণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক। পাশাপাশি ২৪ জন চিকিৎসক, নার্স ও ফিজিওথেরাপিস্টকে প্রশিক্ষণও দেয় চীন। চীনা প্রকৌশলীরা গত বছরের এপ্রিলে এসব যন্ত্রপাতি স্থাপন করে দেন।

বিভাগটির প্রধান অধ্যাপক এম এ শাকুর জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে জুলাই অভ্যুত্থানে আহত ৩৭ জনকে বিনা মূল্যে পুনর্বাসন সেবা দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত মোট ৪৫০ জন রোগী সেবা নিয়েছেন এবং ১১ হাজার চিকিৎসা সেশন সম্পন্ন হয়েছে। তবে কেন্দ্রটির সক্ষমতার পুরো ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না জনবল সংকটের কারণে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রযুক্তিগত দিক থেকে এই কেন্দ্র দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আধুনিক। ৬২টি রোবটের মধ্যে ৫৭টি রোবোটিক পুনর্বাসন যন্ত্র এবং ৫টি ফিজিক্যাল থেরাপি ট্রেনিং বেড রয়েছে। এখানে স্ট্রোক, স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি, মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের রোগ এবং অন্যান্য শারীরিক প্রতিবন্ধিতার রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয়।

চিকিৎসক ও ফিজিওথেরাপিস্টরা জানান, তারা নিজ হাতে রোগীদের সেবা দেন না। বরং নির্দিষ্ট সময় ও কোণে রোবটকে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয় কম্পিউটারের মাধ্যমে। এআইভিত্তিক রোবটগুলো আরও উন্নত — কোনো ভুল নির্দেশনা পেলে তারা তা বুঝতে পারে, থেমে যায় এবং সংশোধনের জন্য বার্তা পাঠায়। প্রতিটি রোবটের সামনের মনিটরে ভিডিও গেমের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা চিকিৎসার সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন পা সোজা করলে তির গিয়ে জন্তুর গায়ে লাগে — এভাবে রোগী খেলার মাধ্যমেই থেরাপি সম্পন্ন করেন।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা আরিফুর রহমান, যিনি অটোরিকশা দুর্ঘটনায় পায়ের গোড়ালিতে আঘাত পেয়েছিলেন, তিনি মনে করেন মানুষের চেয়ে রোবট বেশি নির্ভুল ও ধারাবাহিক। মানুষের পক্ষে দীর্ঘক্ষণ সমানভাবে কাজ করা সম্ভব নয়, কিন্তু রোবট পারে।

তবে কেন্দ্রটির বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এটি সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের বেজমেন্টে প্রায় আট হাজার বর্গফুট জায়গায় চলছে। কিন্তু সব যন্ত্রপাতি সঠিকভাবে বসাতে আরও চার হাজার বর্গফুট প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জনবল। বর্তমানে কেন্দ্রের নিজস্ব জনবল নেই; ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের তিনজন চিকিৎসক, তিনজন ফিজিওথেরাপিস্টসহ মোট ২৯ জন কর্মী রয়েছেন। কেন্দ্রটি ঠিকভাবে চালাতে ৩৮ জন চিকিৎসক, ১৫ জন ফিজিওথেরাপিস্ট, ১৫ জন নার্স ও ২৩ জন সহযোগী স্বাস্থ্যকর্মী — মোট ৯১ জন প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তারা ইতিমধ্যে জনবল অনুমোদনের আবেদনও করেছেন।

এছাড়া পর্যাপ্ত আসবাব ও নিরাপত্তার অভাব রয়েছে। বর্তমানে রোগীদের শুধু ৩০ টাকার বহির্বিভাগের টিকিট কিনতে হয়; থেরাপি ও পরামর্শ বিনামূল্যে। তবে ভবিষ্যতে সর্বনিম্ন আড়াই হাজার থেকে সর্বোচ্চ ছয় হাজার টাকা নির্ধারণের চিন্তা চলছে। ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, শিগগিরই সিন্ডিকেট সভায় বিষয়গুলো চূড়ান্ত হবে।