বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ তাদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন মুহূর্ত—যেমন ভ্রমণ, খাবার বা বন্ধুদের সাথে আড্ডা—তুলে তাৎক্ষণিকভাবে অনলাইনে শেয়ার করে। তবে এই অভ্যাসের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়: অন্য কারও ছবি পোস্ট করার আগে কি তার অনুমতি নেওয়া উচিত? অনেক সময় আনন্দের বশবর্তী হয়ে তোলা একটি ছবি হয়তো সেই ব্যক্তির পছন্দ নয়, অথবা গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার কারণে সে নিজের ছবি ইন্টারনেটে ছড়াতে চায় না। এই ছোটখাটো বিষয়টি অহেতুক ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করে বন্ধুত্বে ফাটল ধরাতে পারে। তাই কাউকে না জানিয়ে তার ছবি অনলাইনে পোস্ট করা কি কেবল একটি ব্যক্তিগত পছন্দ, নাকি এটি সামাজিক অভদ্রতার পর্যায়ে পড়ে? এ নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।

একবার অনলাইনে ছবি পোস্ট করা হলে তা স্থায়ীভাবে থেকে যায়, কারণ যেকোনো সময় কেউ স্ক্রিনশট নিতে পারে অথবা ছবির মেটাডেটা থেকে সংবেদনশীল তথ্য বের করতে পারে। এই বিষয়টি শুধু মুখের কথা নয়; প্রযুক্তির বাস্তবতা। যুক্তরাষ্ট্রের কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির ২০১১ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু অপরিচিত ব্যক্তির মুখের ছবি ব্যবহার করে ফেসিয়াল রিকগনিশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে তার নাম, ঠিকানা, ব্যক্তিগত পছন্দ এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর পর্যন্ত বের করা সম্ভব। বর্তমানে প্রযুক্তি ২০১১ সালের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। ২০২৩ সালে ক্লিয়ারভিউ এআই নামের একটি প্রতিষ্ঠান স্বীকার করে যে তারা সাধারণ মানুষের সোশ্যাল মিডিয়া থেকে ৩০ বিলিয়নের বেশি ছবি সংগ্রহ করে নিজেদের ডেটাবেজে জমা রেখেছে। বন্ধুদের দেখানোর জন্য পোস্ট করা সাধারণ আনন্দের মুহূর্তের ছবিও বিশাল এই ইন্টারনেট জগতে সবসময় সুরক্ষিত থাকে না।

শুধু সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকিই নয়, অনেকে বিভিন্ন ব্যক্তিগত কারণে নিজের ছবি অনলাইনে দিতে চান না। কেউ হয়তো কঠিন মানসিক বা শারীরিক অসুস্থতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, কারও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, অথবা কেউ নিজের চেহারা বা ভঙ্গি পছন্দ করছে না। কারণ যাই হোক না কেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই অন্যের ইচ্ছাকে সম্মান না করে জোর করে তার ছবি অনলাইনে পোস্ট করা একেবারেই ঠিক নয়।

তবে বাস্তবে প্রতিটি ছবির জন্য অনুমতি নেওয়া সবসময় সম্ভব নয়। বড় দলবদ্ধ ছবিতে পেছনে থাকা প্রতিটি মানুষের কাছে গিয়ে অনুমতি নেওয়া কার্যত অসম্ভব। পাবলিক প্লেসে বা সাধারণ জায়গায় কারও ছবি বা ভিডিও তোলা আইনিভাবে অপরাধ নয়। কিন্তু বন্ধু বা পরিচিতদের ছবি তোলার সময় পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি। সবাই মিলে হাসিমুখের একটি সুন্দর ছবি তোলা আর কাউকে না জানিয়ে তার একটি বিশ্রী বা অস্বস্তিকর ছবি ইন্টারনেটে দেওয়া—এই দুটি বিষয় এক নয়। ছবিতে কাউকে অস্বাভাবিক লাগলে তাকে 'তোমাকে তো স্বাভাবিকই লাগছে' বলে মিথ্যা প্রশংসা করাও ভালো আচরণ নয়।

কে ছবি পোস্ট করছে এবং কোথায় পোস্ট করছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। বহু বছরের পুরোনো বন্ধুর সাথে যে স্বাধীনতা কাজ করে, নতুন পরিচিতের সাথে তা করা যায় না। আবার ছবিটি কেবল বন্ধুদের দেখার জন্য প্রাইভেট অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা হচ্ছে, নাকি সবার জন্য উন্মুক্ত পাবলিক পেজে দেওয়া হচ্ছে, তাও ভেবে দেখা দরকার। বিশেষ করে অন্যের সন্তান বা শিশুর ছবি তোলার ক্ষেত্রে সাবধানতা প্রয়োজন। নিজের সন্তান না হলে অন্য যেকোনো শিশুর ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করার আগে অবশ্যই তার মা-বাবার অনুমতি নিতে হবে।

সুতরাং, অনুমতি ছাড়া কারও ছবি পোস্ট করা অভদ্রতা কিনা, তা পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে। পরিচিত বন্ধুদের সাথে তোলা সুন্দর ছবি ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে পোস্ট করলে কিছুটা ছাড় দেওয়া যায়। কিন্তু কোনো ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে তোলা ছবি পাবলিকলি পোস্ট করলে, অথবা সে যদি ছবি তুলতে দ্বিধা প্রকাশ করে, তবে অবশ্যই অনুমতি নেওয়া উচিত। 'ছবিটা কি পোস্ট করতে পারি?'—এই ছোট একটি মেসেজ পাঠাতে মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় লাগে। যদি কেউ তার ছবি মুছে ফেলতে অনুরোধ করে, তবে রাগ না করে বা অজুহাত না দেখিয়ে সঙ্গে সঙ্গে তা সরিয়ে ফেলা উচিত। ছবি সোশ্যাল মিডিয়া থেকে মুছে দিলেও তা ফোনের অ্যালবামে থেকে যাবে এবং সেই সুন্দর স্মৃতি হারিয়ে যাবে না।

অনেকে নিজের ছবি ইন্টারনেটে না রাখতে চান—এটা কোনো ভুল বা অস্বাভাবিক আচরণ নয়; বরং নিজের নিরাপত্তা ও অনলাইন গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য একটি সচেতন সিদ্ধান্ত। সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট