আজ ৫ আগস্ট আন্তর্জাতিক ট্রাফিক লাইট দিবস। আধুনিক নগরজীবনের এই অপরিহার্য আবিষ্কারটিকে সম্মান জানাতেই দিনটি পালন করা হয়। প্রতিদিন অফিসযাত্রা, স্কুল বাসের অপেক্ষা বা যানজটের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমরা প্রায়ই ট্রাফিক লাইটের দিকে তাকাই। লাল বাতি দেখে বিরক্তি আসে, সবুজ বাতিতে স্বস্তি অনুভব করি। টানা কয়েকটি সবুজ সংকেত পেলে দিনটিকে ভালোও মনে হয়। কিন্তু বর্তমান ব্যস্ত নগরজীবনে ট্রাফিক লাইট এতটাই সাধারণ হয়ে গেছে যে এর গুরুত্ব আমরা উপলব্ধি করি না। মাত্র এক শতাব্দী আগেও পৃথিবীতে কোনো বৈদ্যুতিক ট্রাফিক সিগন্যাল ছিল না। তখন ব্যস্ত মোড়ে পুলিশ বা সংকেতদাতার মাধ্যমেই যানবাহন নিয়ন্ত্রিত হতো। দুর্ঘটনা ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। লাল, হলুদ আর সবুজ এই তিনটি রঙই সেই বাস্তবতা পাল্টে দিয়েছে।
অনেকের ধারণা, প্রথম ট্রাফিক লাইটের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। পৃথিবীর প্রথম ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপিত হয়েছিল ১৮৬৮ সালের ১০ ডিসেম্বর লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার প্রাসাদের সামনে পার্লামেন্ট স্কয়ারে। তবে এটি আজকের মতো বৈদ্যুতিক ছিল না। রেলওয়ে প্রকৌশলী জন পিক নাইট রেলপথের সংকেত থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এটি তৈরি করেন। দিনের বেলায় যান্ত্রিক বাহু ওপরে-নিচে তুলে সংকেত দেওয়া হতো, আর রাতে ব্যবহার করা হতো গ্যাসচালিত লাল ও সবুজ আলো। কিন্তু প্রযুক্তিটি বেশিদিন টেকেনি। কয়েক সপ্তাহ পর গ্যাস ল্যাম্প বিস্ফোরিত হয়ে এক পুলিশ সদস্য আহত হন। নিরাপত্তাজনিত কারণে ব্যবস্থাটি তুলে নেওয়া হয় এবং কয়েক দশক ধরে আর কোনো নতুন ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন করা হয়নি।
মোটরগাড়ির সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় আবারও নিরাপদ যানবাহন নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন দেখা দেয়। ১৯১৪ সালের ৫ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ক্লিভল্যান্ড শহরে বিশ্বের প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাফিক লাইট চালু হয়। এই দিনটিকেই স্মরণ করে বর্তমানে আন্তর্জাতিক ট্রাফিক লাইট দিবস পালিত হয়। ওই সিগন্যালে ছিল মাত্র দুটি রঙ—লাল ও সবুজ। পাশাপাশি শব্দের মাধ্যমেও চালকদের সতর্ক করা হতো। মার্কিন পুলিশ কর্মকর্তা লেস্টার ওয়্যার এই ব্যবস্থার নকশা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এর এক দশকের মধ্যেই ইউরোপে বৈদ্যুতিক ট্রাফিক লাইটের ব্যবহার শুরু হয়। ১৯২৪ সালে জার্মানির বার্লিনে বৈদ্যুতিক ট্রাফিক সিগন্যাল বসানো হয়।
প্রথম দিকের ট্রাফিক লাইটে শুধু লাল ও সবুজ ছিল। কিন্তু চালকদের সতর্ক করার জন্য মাঝখানে একটি সংকেতের প্রয়োজন পড়ে। ১৯২৩ সালে তিন রঙের ট্রাফিক সিগন্যাল চালু হয়, যেখানে যোগ হয় হলুদ বা অ্যাম্বার আলো। এটি চালকদের প্রস্তুত হওয়ার বার্তা দেয়। এরপর থেকে লাল মানে থামুন, হলুদ মানে সতর্ক হোন, সবুজ মানে চলুন—এই ভাষা পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই এক। ভাষা ও সংস্কৃতি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু এই তিন রঙের ভাষা সবার কাছে সমান।
ট্রাফিক লাইট শুধু গাড়ি থামায় না, এটি পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পার হতে সাহায্য করে। জরুরি সেবার যানবাহনের চলাচল সহজ করে, যানজট কমাতে ভূমিকা রাখে এবং সবচেয়ে বড় কথা অসংখ্য দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করে। লাল বাতিতে দাঁড়িয়ে বিরক্ত লাগলেও সেই কয়েক সেকেন্ডের অপেক্ষাই কারও জীবন বাঁচাতে পারে। আমরা প্রায়ই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশযান বা স্মার্টফোনের মতো বড় বড় আবিষ্কার নিয়ে কথা বলি। কিন্তু এমন কিছু আবিষ্কারও আছে যেগুলো প্রতিদিন আমাদের জীবনকে নিরাপদ করে তুললেও খুব কমই আলোচনায় আসে। ট্রাফিক লাইট তেমনই একটি উদ্ভাবন। লাল, হলুদ আর সবুজ—মাত্র তিনটি রঙ প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষের পথচলাকে আরও নিরাপদ, আরও সুশৃঙ্খল ও আরও মানবিক করে তুলছে। পরেরবার লাল বাতিতে দাঁড়িয়ে বিরক্ত হওয়ার আগে একবার ভাবা যেতে পারে—এই ছোট্ট অপেক্ষাই হয়তো কারও নিরাপদে বাড়ি ফেরার কারণ।


