নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন এবং লালপুর ও বাগাতিপাড়ার দুই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) প্রত্যাহারের ঘটনা এখন জেলাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। গত মঙ্গলবার জেলা প্রশাসক ও লালপুরের ইউএনও বরকত উল্লাহকে এবং বুধবার বাগাতিপাড়ার ইউএনও দেবাশীষ বসাককে পদ থেকে সরানো হয়। এর ঠিক আগের দিন, সোমবার সন্ধ্যায়, লালপুর ও বাগাতিপাড়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থানীয় বিএনপি ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল। তবে সেই অভিযোগের ভিত্তিতে এখনো কোনো মামলা রেকর্ড করা হয়নি বলে জানা গেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১২ আগস্ট। ওইদিন ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের ফলাফল বাতিলের দাবিতে লালপুর ও বাগাতিপাড়ার ইউএনও কার্যালয়ে বিক্ষোভ দেখায় বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীরা। বিক্ষোভের একপর্যায়ে কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর এবং কয়েকজনকে লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার জেরে ১৭ আগস্ট সোমবার সন্ধ্যায় দুই উপজেলার প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বাদী হয়ে থানায় পৃথক লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। বাগাতিপাড়ার অভিযোগে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের সাতজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ১৪০ থেকে ১৫০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে, লালপুরের অভিযোগে ১৮ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ৬০ থেকে ৭০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগ দায়েরের পরদিনই প্রশাসনে রদবদল শুরু হয়। মঙ্গলবার লালপুরের ইউএনও বরকত উল্লাহকে রাজশাহী কমিশনারের কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয় এবং জেলা প্রশাসক আসমা শাহীনকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। বুধবার বাগাতিপাড়ার ইউএনও দেবাশীষ বসাককে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। একই দিনে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার এ এন এম বজলুর রশীদকেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। এই দ্রুততম সময়ে একাধিক কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়ায় অভিযোগ দায়েরের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র আছে কি না — তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) নাটোরের সাধারণ সম্পাদক বুলবুল আহমেদ বলেছেন, একটি দলের নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে মিছিল করে ফলাফল বাতিলের দাবি জানান। অভিযোগ আছে, তারা ইউএনও কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটিয়েছেন। এ ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মামলা করা স্বাভাবিক। কিন্তু অভিযোগ করার পরপরই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সরিয়ে দেওয়া স্বাভাবিক নয়। এতে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে তারা আর সাহস পাবেন না।
তবে বিএনপির পক্ষ থেকে এই প্রত্যাহারের সঙ্গে অভিযোগের কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করা হয়েছে। জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান বলেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা যেতেই পারে। কিন্তু ঢালাওভাবে দলীয় পদপদবি উল্লেখ করে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করার মধ্যে ষড়যন্ত্র আছে বলে তারা মনে করেন। কর্মকর্তাদের বদলির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই বলেও তারা বিশ্বাস করেন।
বিদায়ী জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বদলির আদেশ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এর সঙ্গে অন্য কিছুর সম্পর্ক তিনি দেখেন না। বদলি বা প্রত্যাহারের বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি লালপুরের সাবেক ইউএনও বরকত উল্লাহ ও বাগাতিপাড়ার সাবেক ইউএনও দেবাশীষ বসাক।
এদিকে, থানায় দেওয়া অভিযোগ তিন দিন পেরিয়ে গেলেও মামলা হিসেবে রেকর্ড হয়নি। লালপুরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাসুদ রানা বলেন, তারা থানায় অভিযোগ দিয়ে এসেছেন। এখন যা করার পুলিশ করবে। তারা অপেক্ষা করছেন। বাগাতিপাড়ার প্রশাসনিক কর্মকর্তা শুকুর আলীও একই কথা বলেছেন। লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করলেও মামলা রেকর্ড না করার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বাগাতিপাড়া থানার উপপরিদর্শক আবদুর রাজ্জাকও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক জানিয়েছেন, এ বিষয়ে অফিসিয়ালি তাকে কেউ জানাননি। তিনি নিজেও এ ব্যাপারে খোঁজখবর নেননি।




