আজ ১৩ আগস্ট, কিউবার কিংবদন্তি বিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রোর জন্মশতবার্ষিকী। ১৯২৬ সালের এই দিনে জন্ম নেওয়া কাস্ত্রো ২০১৬ সালের ২৫ নভেম্বর ৯০ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর পরও কিউবার রাজনীতি, লাতিন আমেরিকার বামপন্থী আন্দোলন এবং যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী সংগ্রামের ইতিহাসে তাঁর প্রভাব অমলিন। প্রায় পাঁচ দশক ধরে কিউবা শাসন করেছেন তিনি, এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতায় এসেছেন ১০ জন প্রেসিডেন্ট, কিন্তু কাস্ত্রো প্রত্যেককে টপকে ক্ষমতায় টিকে ছিলেন। ২০০৬ সালে অসুস্থতার কারণে তিনি ভাই রাউল কাস্ত্রোর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন এবং ২০০৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্টের পদ ছাড়েন।

কাস্ত্রোর পথচলা অবশ্য প্রাসাদ থেকে শুরু হয়নি; শুরু হয়েছিল এক তরুণ আইনজীবীর ক্ষোভ থেকে। পূর্ব কিউবার চিনি উৎপাদনকারী অঞ্চলে তাঁর বেড়ে ওঠা। বাবা ছিলেন স্প্যানিশ অভিবাসী, প্রথমে মার্কিন চিনি কোম্পানিতে কাজ করলেও পরে নিজেই বড় খামারের মালিক হন। জেসুইট স্কুলে পড়ার পর হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন ফিদেল। ১৯৫২ সালে ফুলজেনসিও বাতিস্তা সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করলে কিউবার গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথ বন্ধ হয়ে যায়। তখনই তরুণ আইনজীবী ফিদেল সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নেন। ১৯৫৩ সালের ২৬ জুলাই সান্তিয়াগো দে কিউবার মনকাদা সেনা ব্যারাকে হামলা চালান তিনি ও তাঁর অনুসারীরা। অভিযান ব্যর্থ হয়, বহু সঙ্গী নিহত হন। ফিদেল ও তাঁর ভাই রাউল গ্রেপ্তার হন। কিন্তু কারাগারই তাঁকে জাতীয় রাজনীতির বড় মঞ্চে নিয়ে আসে। আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্যকে তিনি রাজনৈতিক ইশতেহারে রূপ দেন, সেখানেই উচ্চারিত হয় বিখ্যাত উক্তি—'ইতিহাস আমাকে মুক্তি দেবে।'

সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি পাওয়ার পর মেক্সিকোতে চলে যান কাস্ত্রো। সেখানে বিপ্লবীদের সংগঠিত করে ১৯৫৬ সালে 'গ্রানমা' নামের ইয়টে করে কিউবায় ফিরে আসেন। উপকূলে নামার পর সরকারি বাহিনীর আক্রমণে বিপ্লবীদের বড় অংশ নিহত বা ছত্রভঙ্গ হয়। বেঁচে থাকা যোদ্ধাদের নিয়ে সিয়েরা মায়েস্ত্রা পর্বতে আশ্রয় নেন ফিদেল। সেখানেই শুরু হয় গেরিলা যুদ্ধের নতুন অধ্যায়। তিন বছরের লড়াইয়ের পর জনসমর্থন তৈরি হয় বাতিস্তার শাসনের বিরুদ্ধে। ১৯৫৯ সালের জানুয়ারিতে বাতিস্তা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান, এবং ৮ জানুয়ারি বিপ্লবী ক্যারাভান নিয়ে হাভানায় প্রবেশ করেন কাস্ত্রো। মাত্র ৩২ বছর বয়সে তিনি লাতিন আমেরিকার অন্যতম তরুণ শাসকে পরিণত হন।

শুরুতে কাস্ত্রো বলেছিলেন, তাঁর লক্ষ্য গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, সমাজতন্ত্র নয়। সেই আশ্বাসে যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ তাঁর সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি শুরু করেন ব্যাপক অর্থনৈতিক সংস্কার—জমি ও বড় সম্পত্তি পুনর্বণ্টন, বিদেশি মালিকানাধীন সম্পদ জাতীয়করণ, রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি। বাতিস্তা সরকারের সদস্যদের বিচার করা হয়, শত শত মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। গণমাধ্যমের ওপরও আঘাত আসে; স্বাধীন সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে যায়, রাজনৈতিক বিরোধিতা দমন করা হয়। বহু কিউবান নাগরিক দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। একই বিপ্লব তাই কারও কাছে মুক্তির প্রতীক, কারও কাছে নতুন দমনমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার সূচনা।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে কাস্ত্রো সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ঝুঁকলে। যুক্তরাষ্ট্র কিউবার চিনি কেনা বন্ধ করে দেয়; জবাবে কাস্ত্রো কিউবায় থাকা বিপুল মার্কিন সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেন। ওয়াশিংটন ব্যাপক বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং ১৯৬১ সালের ৩ জানুয়ারি কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়। এরপর আসে কিউবার ইতিহাসের নাটকীয় অধ্যায়—১৯৬১ সালের ১৬ এপ্রিল কাস্ত্রো আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর বিপ্লবকে সমাজতান্ত্রিক ঘোষণা করেন। পরদিন সিআইএ-সমর্থিত প্রায় ১ হাজার ৪০০ কিউবান নির্বাসিত 'বে অব পিগস'-এ আক্রমণ চালায়, কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে ব্যর্থ হয়। কাস্ত্রোর জন্য এটি ছিল বিরাট রাজনৈতিক বিজয়। এরপরও কাস্ত্রোকে হত্যার চেষ্টা থামেনি; কিউবার সরকারি হিসাব অনুযায়ী অসংখ্যবার ষড়যন্ত্র হয়েছিল। এসব নিয়ে বিতর্ক থাকলেও মার্কিন গোপন তৎপরতার বিষয়টি ঠান্ডা যুদ্ধের ইতিহাসে সুপ্রতিষ্ঠিত।

বে অব পিগসের এক বছর পর দেখা দেয় আরও ভয়ংকর সংকট—১৯৬২ সালের অক্টোবরে কিউবায় সোভিয়েত পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি কিউবার চারপাশে নৌ অবরোধ ঘোষণা করেন। ১৩ দিন ধরে পৃথিবী অপেক্ষা করছিল—পারমাণবিক যুদ্ধ হবে কি না। শেষ পর্যন্ত নিকিতা ক্রুশ্চেভ ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নিতে রাজি হন, সংকটের অবসান ঘটে। কিন্তু কিউবা তখন ঠান্ডা যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক কেন্দ্র।

ফিদেল কাস্ত্রোর প্রভাব কিউবার সীমানায় আটকে থাকেনি। লাতিন আমেরিকার বহু বিপ্লবী তরুণের কাছে কিউবা হয়ে ওঠে প্রেরণার প্রতীক। আফ্রিকার উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামে কিউবান সামরিক সহায়তা পাঠানো হয়—অ্যাঙ্গোলা, মোজাম্বিক ও দক্ষিণ আফ্রিকায়। পাশাপাশি উন্নয়নশীল বিশ্বে চিকিৎসক ও শিক্ষক পাঠানো হয়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কিউবা বড় পরিবর্তন আনে—সর্বজনীন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা, নারীর অধিকার ও জাতিগত সমতার ওপর জোর দেওয়া হয়। ব্যাপক সাক্ষরতা অভিযান চালানো হয়, এবং কিউবার প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পায়।

তবে বিপ্লবের অন্ধকার দিকও আছে। রাজনৈতিক বহুত্ববাদ সীমিত হয়, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম বন্ধ হয়, শ্রমিক সংগঠনের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো চাপের মুখে পড়ে। 'বিপ্লবী প্রতিরক্ষা কমিটি' গড়ে নাগরিকদের ওপর নজরদারি চালানো হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল তাঁর নীতির অংশ; তবে তিনি ছিলেন সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের নিছক অনুগামী—এমন ব্যাখ্যাও যথেষ্ট নয়। স্তালিনের ব্যক্তিপূজা ও দমননীতির সমালোচনা করতেন তিনি, আবার সোভিয়েত সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধেও সব সময় প্রকাশ্যে অবস্থান নেননি।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন কিউবার অর্থনীতিতে ভয়াবহ ধাক্কা হয়ে আসে। শত শত কোটি ডলারের অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য ও ভর্তুকি বন্ধ হয়ে যায়। 'বিশেষ সময়'-এর কঠিন অর্থনৈতিক সংকটে কাস্ত্রোকে সীমিত ব্যক্তিগত ব্যবসা ও বিদেশি পুঁজির জন্য কিছুটা জায়গা খুলে দিতে হয়। পরে পর্যটনশিল্পের বিকাশে অর্থনীতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আবার শক্ত হয়। এ সময়ও তাঁর স্লোগান ছিল অপরিবর্তিত—সমাজতন্ত্রই পথ।

২০০৬ সালে অসুস্থতার পর কাস্ত্রোর ক্ষমতা কমতে থাকে, ২০০৮ সালে তিনি প্রেসিডেন্টের পদ ভাই রাউলের হাতে তুলে দেন। অবসরেও তিনি রাজনীতি থেকে পুরোপুরি সরে যাননি। জীবনের শেষ দিকে সবচেয়ে প্রতীকী পরিবর্তন—২০১৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর ওয়াশিংটন ও হাভানা কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের ঘোষণা দেয়। দীর্ঘ শত্রুতার পর এটি ছিল ঐতিহাসিক মুহূর্ত, এবং কাস্ত্রো সতর্কভাবে হলেও এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। দুই বছর পর, ২০১৬ সালের ২৫ নভেম্বর রাতে ফিদেল কাস্ত্রো মারা যান।

ফিদেল কাস্ত্রোকে এক কথায় বিচার করা সম্ভব নয়। তিনি বাতিস্তার স্বৈরশাসন উৎখাত করেছিলেন, আবার নিজেও গড়ে তুলেছিলেন দীর্ঘস্থায়ী একদলীয় শাসন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সাধারণ মানুষের নাগালে এনেছিলেন, আবার রাজনৈতিক বিরোধিতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ছোট একটি দ্বীপের প্রতিরোধের প্রতীক ছিলেন তিনি, আবার সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে ঠান্ডা যুদ্ধের ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তাঁর দীর্ঘ বক্তৃতা কিংবদন্তি—১৯৬০ সালে জাতিসংঘে ২৬৯ মিনিটের ভাষণ দীর্ঘ সময় বিশ্ব সংস্থার রেকর্ড ছিল। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে, ২০১৬ সালের এপ্রিলে, কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসে তিনি বলেছিলেন—শিগগিরই তিনি অন্যদের মতো হয়ে যাবেন, কিন্তু কিউবান কমিউনিস্টদের আদর্শ পৃথিবীতে থেকে যাবে। মানুষটি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর উত্তরাধিকার এখনো জীবন্ত প্রশ্ন। একটি ছোট দেশ কি পরাশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজের পথ তৈরি করতে পারে? কাস্ত্রোর উত্তর ছিল—হ্যাঁ। আর বিপ্লব যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিণত হয়, তখন কি স্বাধীনতা বৃদ্ধি পায়, নাকি নতুন ধরনের নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়? এই দুই প্রশ্নের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে ফিদেল কাস্ত্রোর উত্তরাধিকার।